প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস খুনের রাতে নিজেদের বাড়িতে ছিলেন না। পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ফুটবল খেলার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। অন্যদিকে, মুগ্ধও ওই রাতে বাড়িতে ছিলেন না। তবে পুলিশ বলছে, ওই রাতে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করেছিলেন। খুনের ঘটনার পর সেখানেই অবস্থান করেন। সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর পরিবারের সদস্যরা এখন আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
শনিবার (২২ আগস্ট) গভীর রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করার সময় পুলিশ সিদ্ধার্থকে তার চাচার বাড়ি থেকে আটক করে। একই সময়ে, মুগ্ধের বাড়িতে পুলিশ উপস্থিত হলে তিনি পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তাকে শ্মশান এলাকা থেকে আটক করা হয়।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১০টায় মাছুয়াপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পুরো এলাকায় থমথমে পরিবেশ ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সিদ্ধার্থের বাড়িতে তার মা পাপড়ী রানীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। সে জানিয়েছিল, ফুটবল খেলতে যাবে। এবং তারপর সে পাশের বাসার বন্ধু সীমান্তের বাড়িতে ছিল বলে তিনি জানান। শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে সিদ্ধার্থ বাড়িতে ফেরে।
সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস বলেন, মুগ্ধই এক নম্বর নেশাখোর! সে সব সময় আমার ছেলেকে ডেকে ডেকে খাওয়াত। তারা দুজনে খুন করেছে, নাকি অন্য কেউ ছিল, সেই বিষয়ে তারা বলতে পারবে। আমি শুধু এটাই বলব, আমার যা সত্য জানা আছে, আমি বলে দিয়েছি। প্রশাসন ওকে গুলি করে মারুক। খারাপকে রাখার দরকার নেই। কিন্তু তারা কি দুইজনে চারজনকে খুন করতে পারে? আপনারাই বলুন। পুলিশ তো ওকে আটক করেছে, এখন আমরা আতঙ্কে আছি।
তবে সীমান্তের বাবা সুবাস দাসের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার ছেলে সীমান্ত বাড়িতে ফেরে। রাত ১২টার দিকে সিদ্ধার্থ তাদের বাড়িতে এলেও কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে যায়। সীমান্ত সেদিন রাতে বাড়িতেই ছিল, কিন্তু সিদ্ধার্থ তার সঙ্গে ছিল না।’
পুলিশ দাবি করেছে, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তারা সীমান্তের বাড়িতে ইয়াবা সেবন করেন। পরে তারা গণপতির বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। বিষয়টি গণপতি দেখে ফেলায় তাকে হত্যা করা হয়, বলেছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।
মুগ্ধের বাড়িতে গিয়ে তার মা সেনা রানীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ বাড়িতে ছিলেন না। শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে ঘুম থেকে উঠে তিনি ছেলের ঘরে তালা দেখতে পান। পরে তালা খুলে মুগ্ধকে দেখতে পাননি। সকাল ১১টার দিকে মুগ্ধ বাড়িতে ফিরে আসে।
সেনা রানী বলেন, সকালে উঠে দেখি ঘরে তালা। তালা খুলে দেখি মুগ্ধ নেই। পরে ১১টার দিকে বাসায় এসে হাত-মুখ ধুয়ে নেয়। আমি বাজারে যেতে বললে সে বলে, আজ যাবে না।
তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে দোষী হলে তাকে শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত তা বের করা হোক। আমরা ভয়ে আছি। দেখা গেল যে আমরা রাস্তায় বের হচ্ছি, বলল এই যে খুনির মা, ধরো! বের হলে ভয় লাগে, বাসাতেও ভয় লাগে।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় মাদকের বিস্তার বেড়ে গেছে। উঠতি বয়সের ছেলেরা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সহজে পাচ্ছে। মাদক কারবারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়াও দুইজন মিলে চারজন মানুষকে কীভাবে হত্যা করে, এর পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না তা দ্রুত বের করতে হবে।
এ ঘটনায় গতকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়েছে। হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও প্রকৃত অপরাধী শাস্তির আওতায় আনার দাবি রাখছেন শিক্ষার্থীরা।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন পরিবারের অভিভাবক। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ছেলে প্রিয়ম ও মেয়ে আগামীকে নিয়ে তার সংসার ছিল। শনিবার গভীর রাতে মাছুয়াপাড়ার কাছে তাদের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্বজনেরা জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা শনিবার বাড়িতে গিয়ে চারজনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেন।
পুলিশ চারটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত সাড়ে ১০টায় নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
এ ঘটনার পর শনিবার রাতে প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাস (১৯) কে আটক করে পুলিশ। রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-২–এ তাদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলেন, আসামিরা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দিতে হত্যা কান্ডে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
এর আগে, রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মাদ আবদুল মাবুদ বলেন, ছাদে ইয়াবা সেবনের বিষয়টি গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলেছিলেন। পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয়। পরে তার পরিবারের আরও তিন সদস্যকে একে একে খুন করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তী স্যার ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তার পরিবারের কারো সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধ বা শত্রুতা ছিল না। হত্যার পর আসামিরা ওই বাসায় অবস্থান করেন, গোসল করেন এবং খেজুর ও শসা খান।
এই ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন