প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘটে। এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আদালত এই নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের ওপর আঘাত হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত জানায়, এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থার জন্যও একটি হুমকি। আদালতটির ১২৫টি সদস্যদেশকে এর কার্যক্রম রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আদালত প্রতিষ্ঠার রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেছে, তবে তা অনুমোদন করেনি। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে আদালতটির বিরোধিতা করে আসছে। এর আগে আদালতের কয়েকজন বিচারক ও আইনজীবীদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
এবারের নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত। আদালতকে সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এর ফলে ব্যাংক, বিমা, সফটওয়্যার এবং অন্যান্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আদালতের লেনদেন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আদালতটিকে নিয়ন্ত্রণহীন আদালত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "ট্রাম্প কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে আমেরিকানদের বিচার করতে দেবেন না।" তিনি জানান, আদালতের সম্পদ ও কার্যক্রম সীমিত করতেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
ছয় মাসের ছাড়, এরপর কঠোর ব্যবস্থা
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের সময় দেওয়া হবে। এছাড়া টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন পরিশোধ এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে ছাড় রাখা হয়েছে।
রুবিওর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর করার জন্য আদালত ও এর সদস্যদেশগুলোকে সুযোগ দিতেই এই সময়সীমা রাখা হয়েছে। মার্কিন দাবি পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সহ দেশটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করায় যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই আদালতটির সমালোচনা করে আসছে। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আদালতের তদন্তের বিষয়েও ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে। তবে আদালত মার্কিন সেনা, সীমান্তরক্ষী বা নির্বাচিত নেতাদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে—এমন কোনো পদক্ষেপের কথা জানায়নি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনি পরামর্শক নাজহাত শামীম খান রয়টার্সকে বলেন, "নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাজকে দুর্বল করা।" তবে তিনি জানান, তদন্ত ও বিচারসহ আদালতের সব কার্যক্রম চলবে।
ইউরোপের উদ্বেগ, পাল্টা ব্যবস্থার ভাবনা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, ছয় মাসের সময়সীমা আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কাজ অব্যাহত রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতটিকে সুরক্ষা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ব্লকিং আইন’ কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ধরনের আইন ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে রক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত ও যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় ৭০ জনেরও বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তাদের মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, নেতানিয়াহু, হামাসের কয়েকজন নেতা, সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির এবং লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির নাম রয়েছে। কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াট্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ পরে প্রত্যাহার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে আদালতটি থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানালেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্যদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া ন্যাটোর অন্য সদস্যদেশগুলো আদালতটির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। আদালতটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত।
নোবেল শান্তি পুরস্কারেও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রসঙ্গ
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
নোবেল কমিটি জানায়, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, তখন এ পুরস্কার আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রতি সমর্থনের বার্তা বহন করছে।
কমিটির বক্তব্য, যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শান্তিপূর্ণ বিশ্বের জন্য অপরিহার্য।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নিষিদ্ধ সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারে না। ফলে ব্যাংক হিসাব বন্ধ, বিমা সেবা প্রত্যাহার এবং সফটওয়্যার ব্যবহারে বাধা তৈরি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কয়েক মাস ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আদালতের কর্মকর্তারা মাইক্রোসফটের সফটওয়্যার থেকে মুক্ত উৎসের বিকল্প ব্যবস্থায় কম্পিউটার স্থানান্তর এবং ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমার বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির কাজ করেছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আদালতের কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও জো বাইডেনের প্রশাসন পরে তা প্রত্যাহার করেছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই আদালতের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসে।
সূত্র: রয়টার্স
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন