প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
দেশের অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচালিত জুয়ার বিস্তার রোধে সরকার যুগোপযোগী নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনের নাম জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬, যা প্রায় ১৫৯ বছর আগে প্রণীত (পাবলিক গাম্বলিং এ্যাকট ১৮৬৭) আইনটিকে রহিত করেছে।
রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বুধবার (১ জুলাই) আইনটি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে। আইনটি এর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে গেছে।
নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো ডিজিটাল অপরাধের পরিষ্কার সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে।
একইসঙ্গে বলা হয়েছে যে এসব কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামো, ভিপিএন বা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, বেটিং পরিচালনা, অ্যাকাউন্ট খোলা বা ব্যবহার, জুয়ার অর্থ জমা, উত্তোলন কিংবা স্থানান্তর করা অপরাধ বলে গণ্য হবে।
বিদেশি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি, এজেন্ট বা সহযোগী হিসেবেও কাজ করা যাবে না। সাধারণ জুয়ার অপরাধের জন্য সর্বাধিক দুই বছর কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বাধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ১ কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।
অনলাইন বেটিং, বুকমেকার হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা কিংবা ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করার অপরাধের জন্য সর্বাধিক সাত বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বাধিক সাত বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বাধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন।
জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জুয়ার প্রসারে অংশগ্রহণ করলে গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি সর্বাধিক তিন বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট অথবা অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার অপরাধে সর্বাধিক ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। তবে সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বাধিক ১০ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
আইনে জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর, গোপন বা বৈধ করার চেষ্টাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সাথে সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে এ ধরনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনেও বিচার হবে।
নতুন আইনের অধীনে আদালতকে অপরাধে ব্যবহৃত বা অপরাধলব্ধ ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ডিভাইসসহ সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত ভবন, অফিস, কল সেন্টার, সার্ভার অবকাঠামো বা অন্য কোনো সম্পত্তি আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা যাবে।
কোনো কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং প্রোভাইডার বা পেমেন্ট গেটওয়ে এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকা সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। আদালত ওই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিলের নির্দেশ দিতে পারবেন। আইনটি উল্লেখ করে বলা হচ্ছে যে, অনলাইন জুয়া ও সাইবার স্পেস ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হবে। অন্য অপরাধের বিচার হবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী।
এসব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচের পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অপরাধের তদন্ত করবেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে ফ্রিজ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
আইনে সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (ডিপিআই), ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেম, ডেটা অ্যানালিটিক্সসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া শনাক্ত ও প্রতিরোধের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ, এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেম, বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন এবং ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালু করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইন বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), নির্বাচন কমিশন, সিআইডি, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ এবং জনসচেতনতার কার্যক্রম পরিচালনারও বিধান রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন আইন কার্যকর করার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত পাবলিক গ্যামলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত হয়েছে। তবে পূর্ববর্তী আইনের অধীনে চলমান মামলা ও কার্যক্রম নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন