প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
জমির মালিকানা পাওয়ার পর কেনা কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে সরকারি রেকর্ডে মালিকানা নথিভুক্ত করার জন্য নামজারি বা মিউটেশন বাধ্যতামূলক। নামজারি ছাড়া জমি ক্রয়-বিক্রয়, দান এবং খাজনা প্রদান সম্ভব নয়।
সম্প্রতি নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়ায় ভূমি মন্ত্রণালয় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমিতে ভাগ-বাটোয়ারা না হলে আলাদা খতিয়ান তৈরি হবে না, বরং একই খতিয়ানে সকলের নাম যৌথভাবে থাকবে। এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের জন্য যৌথ নামজারির জন্য আলাদা বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন নেই। তবে যদি আলাদা খতিয়ান করতে চান অথবা পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চান, তাহলে নিবন্ধিত আপোষ-বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন নিয়মে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কেবল যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ যথেষ্ট। কিন্তু জমি ভাগ করে আলাদা আলাদা খতিয়ান চাইলে রেজিস্টার্ড বণ্টননামা লাগবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিয়মের মাধ্যমে বিশেষ করে ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত জমির ক্ষেত্রে ‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’ নীতি চালু হয়েছে। এতে সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকের নাম নিশ্চিত করা এবং ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ কমানো সম্ভব হবে। এছাড়া, যৌথ নামজারির বাধ্যবাধকতা ওয়ারিশদের মধ্যে স্বচ্ছতা আনবে এবং নামজারি ছাড়া জমি বিক্রি বন্ধ হলে অবৈধ দখলও কমবে বলে মনে করছেন তারা।
অন্য কারও কাছ থেকে কিনে অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার ক্ষেত্রে কেবল জমির রেজিস্ট্রেশন করলেই কাজ শেষ হয় না, নামজারির মাধ্যমে সরকারি রেকর্ডে জমির নতুন মালিকের নামও নথিভুক্ত করতে হয়। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে নামজারির আবেদন করা সম্ভব। নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি করা হয়।
যদি জমির নামজারি না করা হয়, তাহলে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। যেমন— মালিকানার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং রেকর্ডে নাম না থাকলে অবৈধ দখলদার কিংবা অন্য ওয়ারিশ জমির দাবি করতে পারে।
নতুন আইনে নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া কোনো জমি রেজিস্ট্রি, দান কিংবা হেবা করা যাবে না। এছাড়া ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দিতে গেলেও খতিয়ান নিজ নামে থাকতে হবে।
নামজারির নিয়মে এসেছে বেশকিছু পরিবর্তন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে থাকা পরিবর্তিত নিয়ম এখন থেকে কার্যকর করা হয়েছে, যেখানে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে ওয়ারিশদের ‘সবার নাম একসঙ্গে’ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আগে বাবা মারা গেলে পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে কেউ একজন নিজের নামে আলাদা নামজারি করে নিতে পারতেন। তবে, এখন থেকে সেটি আর হবে না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথভাবে নামজারি করতে হবে। যেটি ‘কো-শেয়ারার’ হিসেবে দেখানো হবে।
এ ক্ষেত্রে আবেদনের সময় সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একসঙ্গে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। যদি কোনো ওয়ারিশ বাদ পড়ে, তবে আবেদন নামঞ্জুরও হতে পারে।
এছাড়া, শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদনও এখন আর নামঞ্জুর করা যাবে না। নতুন নিয়মে ওয়ারিশ সনদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে নিতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পৃথক খতিয়ানের জন্য যা লাগবে
অংশীদাররা যখন পৈতৃক কিংবা যৌথ মালিকানাধীন কোনো সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে যার যার অংশ বুঝে নেন এবং সেটি সরকারিভাবে নিবন্ধন করান, তখন সেই লিখিত চুক্তিপত্রকে রেজিস্টার্ড বণ্টননামা বলা হয়। এক্ষেত্রে ওয়ারিশরা যদি নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন, তাহলে আলাদা আলাদা খতিয়ান করা যাবে। তবে এতেও একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তা হলো- ‘নিবন্ধিত বণ্টননামা’ বা ‘আপস-বণ্টননামা দলিল’ থাকতে হবে।
অর্থাৎ, এখন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির দুটি পথ। এর মধ্যে একটি হলো যৌথ নামজারি বা সবাই মিলে এক খতিয়ানে নাম উঠবে। যেখানে প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যাও উল্লেখ থাকবে। অথবা পৃথক নামজারি- নিবন্ধিত বণ্টননামা অনুযায়ী প্রত্যেকে নিজ নামে আলাদা খতিয়ান পাবেন।
নামজারি ছাড়া হবে না রেজিস্ট্রেশন
আগে অনেক সময় নামজারি ছাড়াই জমি ক্রয়-বিক্রয় হতো। তবে নতুন আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া কোনো জমি কেনা-বেচা, দান কিংবা হেবা করা যাবে না। এতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনের সময় নামজারির খতিয়ান দেখানো বাধ্যতামূলক।
এক্ষেত্রে, আগে নামজারি করা থাকলে নতুন করে নামজারির প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, কারও জমি ২০১৫ সালে নামজারি করা থাকলে, তার নতুন করে নামজারির প্রয়োজন নেই। সহজ কথায়, যাদের নামজারি আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং খতিয়ান সঠিক আছে, তাদের নতুন করে নামজারি করতে হবে না।
তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পুরোনো রেকর্ডগুলো ডিজিটাইজড হয়েছে কি-না, সেটি অনলাইনে যাচাই করে নেওয়া ভালো। ডিজিটাল সিস্টেমে রেকর্ডগুলো নথিভুক্ত না থাকলে ভবিষ্যতে খাজনা বা জমি বিক্রিতে সমস্যা হতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয় জমির নামজারির আবেদন জমা হওয়ার ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়াটি নিষ্পত্তি করতে চায়। এ ক্ষেত্রে আবেদন করতে দলিলের কপি বা রেজিস্ট্রি দলিল, আগের খতিয়ানের কপি ও দাগ নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, ওয়ারিশসূত্রে হলে ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যুসনদ এবং নির্ধারিত ফি-এর রসিদ প্রয়োজন হবে। তবে কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে কিংবা জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এই নিয়মের বড় ৩টি সুফল দেখছেন। প্রথমত, এর ফলে ওয়ারিশদের মধ্যে প্রতারণা কমবে। একজন সব জমি নিজের নামে করে নিতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, সরকারি রেকর্ড আপডেট হবে। জমির প্রকৃত মালিক কে, সেটি সহজেই জানা যাবে এবং তৃতীয়ত, জমি সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা কমবে। কারণ, যৌথ নাম থাকায় অংশীদারদের সবাই খতিয়ানে স্বীকৃতি পাচ্ছেন।
তবে নতুন এই নিয়মের কারণে মাঠপর্যায়ে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, অনেক পরিবারের কোনো সদস্য বিদেশে থাকেন অথবা কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই, ফলে সবার কাগজ একসঙ্গে জমা দেয়া কঠিন হওয়ায় ওয়ারিশ খুঁজে বের করাও জটিল হতে পারে। আবার আলাদা খতিয়ান করতে হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হবে। এতে অতিরিক্ত খরচ ও সময়ের প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া, কম সময়ে এই প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করতে ভূমি অফিসের চ্যালেঞ্জও বাড়বে। এ জন্য ৪৫ দিনে প্রক্রিয়াটি নিষ্পত্তি করতে হলে তহশিল অফিস ও এসি ল্যান্ড অফিসের জনবল বাড়াতে হবে।
ভূমি আইনজীবীদের ভাষ্য, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি’ নিশ্চিতের জন্য নতুন এই নিয়ম ভালো উদ্যোগ। বিশেষ করে এটি নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষায় সহায়ক হবে।
জমির নামজারির ক্ষেত্রে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জমি ক্রয়ের পর দলিল রেজিস্ট্রির ৯০ দিনের মধ্যেই নামজারির আবেদন করা উচিত। আর ওয়ারিশি জমি হলে পরিবারের সঙ্গে বসে, সবাই মিলে যৌথ নামজারি করা যেতে পারে। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে বণ্টননামা করে আলাদা হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন