প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
‘লাশ পেয়েছেন, কাঁদতে পারবেন না। কাঁদলে লাশ গায়েব করে দেবো।’ শহীদ ইমনের মা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জানান, জুলাই আন্দোলনে নিহত ১৪ বছরের ইমনের মরদেহ পাওয়ার পর আওয়ামী লীগের একজন নেতার কাছ থেকে তিনি এমন হুমকি পেয়েছিলেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় ২৩ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি প্রদান করেন। নিরাপত্তার কারণে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মামলার পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে ইমনের মায়ের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। মামলায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল।
জবানবন্দিতে ইমনের মা বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকাল ৭টার দিকে ইমন বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যায়। সন্ধ্যার দিকে তিনি তেঁতুলতলা মোড়ে ছেলেকে দেখতে পান। সেদিন গুলিতে ইমনের বোনের ভাশুরও নিহত হন। ছেলেকে বাসায় ফিরে যেতে বলার পর তিনি তার মরদেহ দেখতে তেঁতুলতলা মোড়ে যান। পরে কারফিউ জারি হলে তিনি বাসায় ফিরে আসেন।
তিনি আরও বলেন, আমি ছেলেকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু শহীদ ইয়ামিনের একটি ভিডিও দেখিয়ে ইমন বলেছিল, "দেখছো, আমার বয়সী ছেলেদের কীভাবে মেরে ফেলছে। আমি কেন আন্দোলনে যাবো না?"
পরদিন ২০ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে খাওয়া-দাওয়া করে ইমন তার বন্ধু নাঈম ও শাহীনকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে যায়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শাহীন বাসায় এসে ইমনের বড় ভাই রাজীবকে জানায়, ইমন গুলি খেয়েছে।
খবর পেয়ে ইমনের মা, বাবা ও বড় ভাই রাজীব এম জেড হাসপাতালের সামনে তেঁতুলতলা মোড়ে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা চারদিক থেকে গুলি চলতে দেখেন। এমনকি ওপরের দিক থেকেও গুলি ছোড়া হচ্ছিল বলে জবানবন্দিতে জানান ইমনের মা।
তেঁতুলতলা মোড়ে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ইমনকে পড়ে থাকতে দেখেন তারা। তার জ্ঞান ছিল না। ছেলের এমন অবস্থা দেখে মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তিনজন ব্যক্তি ইমনকে রিকশায় করে বাসার সামনের রাস্তায় নিয়ে আসেন। অচেতন অবস্থায় ইমনের মাকেও বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
জ্ঞান ফেরার পর ছেলের মরদেহের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইমনের মা বলেন, ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেখি, মাথার পেছনে খুলিতে গুলির একটি চিহ্ন। বাম গালের চামড়া ইঁদুরের গর্তের মতো হয়ে ঝুলে ছিল। বুকের একপাশেও গুলির চিহ্ন দেখতে পাই।
এ সময় লম্বা চুলওয়ালা আওয়ামী লীগের এক নেতা এসে তাকে ধমক দেন বলেও জানান তিনি। ওই নেতা বলেন, "লাশ পেয়েছেন, কাঁদতে পারবেন না। না হলে লাশ গায়েব করে দেবো।"
পরে ইমনের মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আরও বাধার মুখে পড়তে হয় বলে জানান তার মা। এলাকার একটি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনতে গেলেও ইমনের বড় ভাই রাজীবকে তা দেওয়া হয়নি। পরে অন্য একটি মসজিদ থেকে খাটিয়াসহ গোসল করানোর লোক নিয়ে আসা হয়।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, রাত ১১টার দিকে ইমনের জানাজা শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তারা। তখনও চারদিক থেকে গুলি চলছিল। গ্রামের পথে তিন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের গাড়ি আটকে দেন। পরে অনুরোধ করে সেখান থেকে ছাড়া পান তারা।
পরদিন ২১ জুলাই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছান তারা। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ১৪ বছরের ইমনকে।
সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ছেলের হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামকে দায়ী করেন ইমনের মা। এ সময় অঝোরে কাঁদতে থাকেন তিনি।
ইমনের মা বলেন, "১৯ জুলাই যদি কারফিউ না দেওয়া হতো, তাহলে আমার ছেলে বেঁচে থাকত।" তিনি ছেলের হত্যার বিচারও দাবি করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন