প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে আদালতে মুখোমুখি করা হয়েছিল।
শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মামলার মূল তদন্ত ও অভিযোগের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনেন। অপ্রাসঙ্গিক ও রাজনৈতিক বক্তব্য শুরু হলে বিচারক তৎক্ষণাৎ বাধা দেন। তিনি রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিকে থামিয়ে দিয়ে নির্দেশ দেন— রাজনীতির কথা বাদ দিয়ে মামলার মূল বিষয়বস্তু ও অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তি উপস্থাপন করতে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের নিথর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সেই রাতেই জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনি প্রক্রিয়ার জন্য শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয়।
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম আত্মহত্যার প্ররোচনার গুরুতর অভিযোগ এনে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, এমপির প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন।
এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে এদিন দুপুরে শেরেবাংলা নগর থানা থেকে দুই আসামিকে আদালতে নেওয়া হয়। দুপুর ২টা ২২ মিনিটের দিকে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।
পাঁচটি কারণ দেখিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা সরকার দুইজনকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন।
তাদের ৩টা ১২ মিনিটের দিকে সিঁড়ি মাড়িয়ে পঞ্চম তলার এজলাসে তোলা হয়। এ সময় তাদের হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুকে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ছিল। আসামিদের কাঠগড়ায় নেওয়ার পর এসব খুলে দেওয়া হয়।
বিচারক এহসানুল ইসলাম এজলাসে ওঠেন ৩টা ১৫ মিনিটে। ৩টা ১৬ মিনিটের দিকে মামলার শুনানি শুরু হয়।
রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. শামসুজ্জোহা।
আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান রিমান্ড আবেদন বাতিল করে জামিনের আবেদন জানান। তিনি বলেন, "দুই আসামির মধ্যে একজন রানিং এমপি, আরেকজন জামায়াতের কর্মী। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা।"
এ সময় নজরুল ইসলাম আরেক আইনজীবীকে ডেকে বলেন, "বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা বলেনি।"
আইনজীবী মাহবুবুর বলেন, "নজরুল ইসলাম চারবারের এমপি। এ মামলায় তাদের রিমান্ডে নেওয়ার মত বিন্দু বিসর্গ কিছু উপস্থাপন করতে পারেনি। তিনি একজন বয়স্ক মানুষ। রাষ্ট্রের একজন আইন কর্মকর্তা। আমরাও মৃত্যুর বিচার চাই। তবে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো প্রয়োজন নেই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে রিমান্ড আবেদন বাতিল করে তাদের জামিন দেওয়া হোক। আমরা সবকিছুতে সহযোগিতা করব। পালিয়ে যাওয়ার মত লোক আমরা নই।"
তিনি একজন আইনজীবীকে ডেকে বলেন, "রোববার আমি আদালতে ছিলাম।"
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, "মামা ওবায়দুর রহমানকে প্রলোভন দেখিয়ে মরিয়মকে বিয়ে করেন এমপি নজরুল ইসলাম। প্রথম স্ত্রীকেও রাজি করান মরিয়মকে বিয়ে করাতে। ওই মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন হোটেল, মোটেলে যাওয়ার ভিডিও দেখা যায়। তারা ন্যাম ভবনে বাস করতেন। ২০ তারিখে মরিয়ম আত্মহত্যা করে। সুইসাইড নোটও পাওয়া যায়। আত্মহত্যায় প্ররোচনা অভিযোগে মামলা হয়েছে। হত্যার বিষয় উড়িয়ে দিতে পারি না। সবকিছুতে পূর্ব পরিকল্পনা ছিল। আমরা শুনে এসেছি, জামায়াতে ইসলামীর লোক সৎ।"
এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, "এ মামলার ঘটনায় থাকি। পলিটিকাল বিষয়ে না যাই।"
পরে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ফারুকী বলেন, "সৎ লোকের শাসন দেখছি। তাদের রিমান্ডের প্রার্থনা করছি।"
মাহবুবুর রহমান বলেন, "তারা দুইজনই বয়স্ক মানুষ। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। নজরুল ইসলাম একজন আইন প্রণয়ন কর্মকর্তা। ঘটনা একটা ঘটে গেছে।"
উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত নজরুল ইসলামকে চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
মামলার এজাহারে নিহতের বাবা মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, ঘটনাটির সূত্রপাত গত জুন মাসে। নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের সরাসরি মধ্যস্থতা ও আগ্রহে সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে পিঁড়িতে বসেন বাদীর ১৯ বছর বয়সী বড় মেয়ে মরিয়ম। বিয়ের পর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে স্বামী নজরুল এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে একই ছাদের নিচে সংসার শুরু করেন তিনি।
তবে সেই সংসার মরিয়মের জন্য সুখের হয়নি। পরিবারের কাছে মরিয়ম কান্নাকাটি করে জানিয়ে গেছেন— বিয়ের পর থেকেই তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে স্বামী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা মিলে প্রতিনিয়ত তার ওপর অমানুষিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতেন।
রোববার বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে হঠাৎ করেই মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর ফোনে কল দেন সংসদ সদস্য নজরুল। ফোনে তিনি তাড়া দিয়ে বলেন দ্রুত তাদের বাসায় পৌঁছাতে। খবর পেয়ে বাবা হন্তদন্ত হয়ে ন্যাম ভবনে ছুটে যান। ঘরের ভেতর কেবল নিজের আদরের মেয়ে মরিয়মের নিথর দেহটি ঝুলতে দেখেন হতভাগা বাবা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন