প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন করে তৈরি হয়েছে। দলে একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হতে চলেছে। যদি তিনি রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে দলটির মহাসচিব পদটি শূন্য হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে— মির্জা ফখরুলের স্থানে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে কে থাকছেন?
আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকেই রাষ্ট্রপতি পদে দলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে মহাসচিব পদে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পাচ্ছে।
এই পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তার সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও এই আলোচনায় চলে এসেছে।
রিজভীই কি এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা?
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, মহাসচিব যদি কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত হন বা অক্ষম হন, তবে সিনিয়র পর্যায়ের একজন নেতা সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সেই দিক থেকে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে অনেক নেতা মনে করছেন যে রুহুল কবির রিজভী এগিয়ে থাকবেন।
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন রিজভী। আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এবং মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও সফলতায় বড় বিষয় হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তবে মহাসচিব পদ নিয়ে দলের ভেতরে পূর্ণ একমত নেই সবাই। স্থায়ী কমিটির কয়েকজন প্রবীণ নেতা মনে করছেন, মহাসচিব একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদ। এই কারণে যদি স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে দলের নীতিনির্ধারণী কাঠামো ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকর হবে।
এই দিক থেকে সালাহউদ্দিন আহমদের নামও আলোচনায় রয়েছে।
গঠনতন্ত্রে কী আসে
বিএনপির গঠনতন্ত্রে ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ নামের কোনো স্থায়ী পদ নেই। সুতরাং, যদি মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে তার স্থানে কাউকে সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, অথবা সরাসরি নতুন মহাসচিব নির্বাচন করা হবে— এই সবকিছু দলীয় সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, মহাসচিব জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। তাই স্থায়ীভাবে নতুন মহাসচিব নির্বাচন করতে হলে কাউন্সিলের বিষয়টিও সামনে আসবে। এর আগে সাংগঠনিক প্রয়োজন বিবেচনা করে অস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
এই বিষয়ে রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে এখনও কিছু জানেন না। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ভালো জানেন।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আজ ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ফলে আজই পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন। এর ফলে আরও সামনে চলে আসবে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিবের সম্ভাব্য নামও।
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টিকে কেবল একজন ব্যক্তিকে বঙ্গভবনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সেই সঙ্গে, দলটি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের কথাও বলছে।
বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির বেশিরভাগ দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের উপর নির্ভরশীল। তাই রাষ্ট্রপতির পদটি এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। তবে জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বঙ্গভবনের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সে কারণে রাষ্ট্রপতি পদে কে দায়িত্ব নিচ্ছেন, এটি আর শুধু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। এটা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক কাঠামোর দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি পদে একটি রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ, দলের প্রতি আস্থাশীল এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে সক্ষম একজনের প্রয়োজন।
কেন মির্জা ফখরুল?
এখন পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব হিসেবে এক দশকের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদ সদস্যও ছিলেন এবং সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক জীবনের মামলাসমেত গ্রেপ্তার ও কারাবরণের পাশাপাশি কঠিন সময়েও তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে নেতা-কর্মীদের সংগঠিত রাখতে সক্ষম ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছেও তিনি আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
দলীয় সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভূমিকা এবং দলের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নগুলো বিবেচনায় রেখেই রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম গুরুত্ব পাচ্ছে।
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, কাউন্সিল
মহাসচিবের পদটি দ্রুত পূরণের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে বিএনপির সামনে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় কর্মসূচি, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের পরিস্থিতি এবং দলের কাউন্সিল— সব মিলিয়ে সামনে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি।
এই কারণে মহাসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদটি দীর্ঘ সময় শূন্য রাখার সুযোগ নেই, এমনটিই মনে করছেন দলের নেতা-কর্মীরা।
রুহুল কবির রিজভীকে ঘিরে দলটির ভেতরে মতবিরোধ থাকলেও তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ, আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন অনেকে। অন্যদিকে, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের পক্ষে থাকা নেতারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে সাংগঠনিক নেতৃত্বের সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছেন।
অতএব, শেষ পর্যন্ত মহাসচিব পদে কে আসছেন, সে বিষয়টি বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনাও বর্তমানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনেও নতুন হিসাব
যদি মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে তার সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য হয়ে যাবে। সেই ক্ষেত্রে সংবিধান ও নির্বাচনি আইনের নির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী আসনটিতে উপনির্বাচনের আয়োজন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।
এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জার নামও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। গত জাতীয় নির্বাচনে বাবার সমর্থনে প্রচারে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তবে তাকে প্রার্থী করার বিষয়ে বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো নেই।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সামনে একাধিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে মহাসচিবের পদ শূন্য হবে, নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে আসবে। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সম্ভাব্য সাংবিধানিক পরিবর্তন বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন গুরুত্ব পেতে পারে। আরও, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সম্ভাব্য উপনির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব তৈরি হবে।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিএনপির জন্য একজন প্রার্থী বাছাইয়ের প্রশ্ন নয়; বরং এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন