প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
লালমনিরহাটে বন্যার পানি দু'দিন আগে নেমে গেছে। তবে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এখনো বালুর স্তর পড়ে রয়েছে। কোথাও ছয়-সাত ইঞ্চি, কোথাও এক থেকে দুই ফুট পর্যন্ত বালু জমে উর্বর কৃষিজমি ঢেকে ফেলেছে। এর ফলে আমনসহ মৌসুমি ফসল আবাদ নিয়ে কৃষকরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনেক কৃষক আশঙ্কা করছেন, যদি দ্রুত বালু অপসারণ করা না হয়, তবে এসব জমি বছরের পর বছর অনাবাদি অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে।
কৃষকরা বলছেন, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পেরে তারা নতুন করে বালুর অভিশাপে পড়েছেন। জমিতে বালুর স্তর জমে থাকার কারণে চাষাবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু এক বিঘা জমি থেকে বালু সরাতে প্রয়োজনীয় টাকার পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, যা অধিকাংশ কৃষক বহন করতে অক্ষম। এর ফলে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ উদ্ভূত হয়েছে।
বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে নদীভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিস্তার তীব্র স্রোতে নদীতীরের বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা নদীর তীরবর্তী কালমাটি গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বারের আট বিঘা আবাদি জমির মধ্যে বন্যায় পানিতে দুই বিঘা জমি তলিয়ে যায়। পানি সরে যাওয়ার পর তিনি দেখতে পান, ওই দুই বিঘা জমির ওপর প্রায় এক ফুট বালুর স্তর জমে রয়েছে। হতাশ কণ্ঠে তিনি মন্তব্য করেন, জমির ওপর থেকে বালু সরালে তবেই কোনো ফসল ভালো হবে। কিন্তু এত টাকা দিয়ে বালু সরানোর সামর্থ্য তাদের নেই। তিনি আরও বলেন, হয়তো আগামীতে বড় বন্যা হলে কিছু বালু সরে যাবে, কারণ নদীর পানির সাথে বিপুল পরিমাণ বালু জমিতে এসে পড়ে। এই বালুময় জমিতে কোনো ফসল ভালো হয় না এবং এতে কৃষকের ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে।
একই গ্রামের কৃষক আনছার আলী বলেন, তাঁর দশ বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা এখন বালুর নিচে চাপা পড়েছে। তিনি জানান, ‘বড় ধরনের বন্যা হলে হয়তো কিছু বালু সরে যাবে। তা না হলে কয়েক বছর জমি অনাবাদি রাখতে হবে। এক বিঘা জমির বালু সরাতে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাগবে। এই টাকা কোথায় পাব?’
কালীগঞ্জের ভোটমারী ইউনিয়নের শৈলমারী গ্রামের কৃষক রহমত আলী বলেন, তাঁর ৮ বিঘা জমি পানির নিচে ছিল। এর মধ্যে তিন বিঘার জমিতে এখন বালুর স্তর জমে গেছে। তিনি জানান, শুধু তাঁর নয়, প্রায় সব কৃষকের জমির একই পরিস্থিতি।
একই এলাকার কৃষক ওসমান গনি বলেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করেছেন, যা পানিতে তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন জমিতে পলি জমে রয়েছে। হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, তারা অনেক কষ্ট করে চাষাবাদ করছেন। কিছুদিন আগে বন্যায় তাঁর ৩ বিঘা জমির আমন ধান নষ্ট হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় রোপণ করা চারা এক সপ্তাহের ব্যবধানে বন্যার পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। এখন চারা কেনার টাকাও নেই। চারা রোপণ না করলে পরিবার কীভাবে বাঁচবে, তিনি জানেন না।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণ বন্যার সময় নদীর পানির সঙ্গে উর্বর পলি জমে আসে, যা জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। তবে যদি নদীর তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে যায় অথবা প্রবল স্রোতের কারণে পানি প্রবেশ করে, তাহলে সেখানে পলির চেয়ে মোটা বালুর পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। ফলে উর্বর মাটির ওপর বালুর স্তর জমে কৃষিজমি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি চলছে। তিনি কৃষকদের উঁচু জমিতে রাখা আমনের ক্ষেত থেকে চারা তুলে পুনরায় রোপণের পরামর্শ দিয়েছেন।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর রংপুর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদ-নদীর তীরবর্তী এলাকায় বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে বালুর স্তর জমে। তিনি আরও জানিয়েছেন, পরবর্তী বন্যায় কিছু জমি থেকে বালু স্বাভাবিকভাবেই সরে যাবে। তবে অনেক জমিতে বছরের দীর্ঘ সময় ধরে বালু রয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা যায়।
কৃষকেরা দাবি করছেন, শুধুমাত্র ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই হবে না। দ্রুত বালু অপসারণে সরকারি সহায়তা, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা না দিলে নদীতীরবর্তী এলাকার হাজারো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়বেন এমনটাই জানান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন