প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ভোলা, ২৭ আগস্ট, ২০২৬ : শান্ত নদী তেতুলিয়ার পাড়ে অবস্থিত দ্বীপের রানী ভোলা; ওপারের নদী কীর্তনখোলার তীরে দাঁড়িয়ে আছে বরিশাল, যা প্রাচ্যের ভেনিস হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দুই জনপদের মাঝে রয়েছে বিশাল জলরাশি। গাঙ্গেয় দ্বীপ উপকূলের ভোলার মানুষদের জন্য এ পথ পাড়ি দেওয়া যেন শত বছরের দুঃখের প্রতীক, স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী। বরিশালে যেতে হলে সড়কপথে নদী পার হতে হয় ফেরি, লঞ্চ, ট্রলার কিংবা স্পিডবোটের মাধ্যমে। ফেরি বা লঞ্চঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা, যানজট এবং সময়ক্ষেপণ যেন নিত্যদিনের ভোগান্তি। কখনো ফেরি পেতে দেরি, কখনো অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, আবার কখনো বৈরী আবহাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে যায় নৌযান চলাচল। ফলে কয়েক কিলোমিটারের নদী পথই ভোলাবাসীর জন্য দীর্ঘ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নৌপথের শত বছরের অব্যক্ত যন্ত্রণা শেষে এবার সড়ক পথে যুক্ত হতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা। দ্বীপ জেলা ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ভোলা-মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা-রহমতপুর রুটে নতুন মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি ছিল তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি অংশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি বরিশালে নির্বাচনী জনসভায় ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। এর ফলস্বরূপ ভোলাকে জাতীয় মহাসড়কের সাথে যুক্ত করার প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন তিনি। এ অঞ্চলের মানুষ মনে করেন তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি মহাসড়কে যুক্ত হয়ে এক পাড়ের জনপদের সাথে অন্য পাড়ের জনপদের সেতুবন্ধন ঘটাবে। ভোলা, মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী ও রহমতপুরকে ঢাকা-সংশ্লিষ্ট মহাসড়কে যুক্ত করার মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে ঘটবে উন্নয়নের মহাবিপ্লব। এটি হবে এখানকার মানুষের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
এতে আনন্দিত ভোলা জনপদের মানুষ। তবে সড়কের পাশাপাশি ভোলা-বরিশাল সেতুর বাস্তবায়ন করার দাবিও প্রকট হয়ে উঠছে জেলাবাসীর মধ্যে।
তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা-তেঁতুলিয়া, কালাবাদর, ইলিশা এবং বুড়াগৌড়াঙ্গ নদী ও বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত দেশের একমাত্র বিচ্ছিন্ন দ্বীপ জেলা ভোলা। এ জেলার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল নৌপথ। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মহা দুর্ভোগে পড়তে হয় এ জনপদের মানুষদের। রাজধানীর সাথে সড়ক যোগাযোগ না থাকায় মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় অপূর্ণতা ছিল। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদিচ্ছা ও হস্তক্ষেপে সেই প্রতিক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরে ভোলাকে মূল ভূ-খণ্ডের সাথে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার।
স্থানীয়দের মতে, খনিজ গ্যাস সমৃদ্ধ এ জেলায় রুপালি ইলিশ, ধান-সুপারি ও কৃষিপণ্য জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও সড়কের মাধ্যমে মূল ভূ-খণ্ডের সাথে যুক্ত হতে পারেনি আজও। ফলে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পরই পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো এ দ্বীপ জনপদটি।
গত ২২ আগস্ট বরিশালের রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন জেলাকে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এতে স্বপ্ন বাস্তবায়নের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন অবহেলিত ভোলাবাসী। একইসঙ্গে সড়কের পাশাপাশি ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবির বাস্তবায়ন চায় জেলার বাসিন্দারা।
ভোলা পৌরসভার অফিসার পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল আহাদ খান ও বাবুল মিয়া বাসস’কে জানান, দ্বীপ জেলা ভোলা দেশের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে কোন রোগী অসুস্থ হলে তাকে জরুরি ঢাকা বা বরিশাল নিতে হলে নৌপথের ওপর ভরসা করতে হতো। এতে অধিক সময় ও ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলের কারণে কখনো কখনো রোগীর মৃত্যু ঘটে। ফলে আমরা ভোলাবাসী দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক কারাগারে বন্দি ছিলাম। তবে ভোলা-মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে যে মহাসড়কের কাজ সম্পন্ন হলে আমাদের সকলেরই স্বস্তি মিলবে।
ভোলার চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন খান বাসস’কে বলেন, খনিজ সম্পদ গ্যাস, কৃষি, রুপালি ইলিশ ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় জেলা ভোলা। সড়ক পথে ভোলাকে বরিশালের সাথে যুক্ত করতে পারলে এ জেলার ইলিশ মাছ, ক্যাপসিক্যাম ও তরমুজসহ নানা ধরনের তৈরি পণ্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব জনপদে খুব সহজে পৌঁছাতে পারবে। এতে করে জেলার প্রান্তিক কৃষক ও খামারিরা তাদের কৃষি পণ্যের কাক্সিক্ষত মূল্য পাবে।
‘আমরা ভোলাবাসী’ নামক সংগঠনের সদস্য সচিব মীর মোশারেফ অমি বাসস’কে বলেন, আমরা ভোলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল সেতুর জন্য আন্দোলন করে আসছি। তবে আমাদের প্রত্যাশা সড়কের সাথে সেতুর বিষয়টি যেনো সাংঘর্ষিক করা না হয়। ভোলার উন্নয়নের স্বার্থে ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবিটিও যেনো অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
ভোলা প্রেসক্লাব সভাপতি এ্যাড. নজরুল হক অনু বাসস’কে বলেন, ভোলা বাংলাদেশের একমাত্র গাঙ্গেয় জেলা। আধুনিক যুগে এসেও এ জেলাটি এখনো বিচ্ছিন্ন। সেই বিচ্ছিন্ন ভোলাকে দেশের সাথে সংযুক্ত করার জন্য বর্তমান সরকার ভোলা-রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ সাথে যুক্ত করে একটি মহাসড়ক নির্মাণ করতে যাচ্ছে। এতে আমরা খুবই আনন্দিত। তবে সেতু স্থাপনের মাধ্যমে ভোলাকে লাহারহাট-বরিশাল হয়ে সারা দেশের যোগাযোগ সংযুক্ত করাও এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মনে করেন।
ভোলা জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর বাসস’কে বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২২ আগস্ট সড়ক পথে ভোলাকে যুক্ত করার যে ঘোষণা দিয়েছেন তাতে আমরা জেলার মানুষ খুবই খুশি ও আনন্দিত। এ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হলে আমাদের অর্থনীতির কাঠামো অনেকটা পরিবর্তিত হবে। এর ফলে ভোলার যোগাযোগ ব্যবস্থার সুফল পুরো বাংলাদেশ পাবে। সেই সাথে ভোলার গ্যাস সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে। এখানে মিল-ইন্ডাস্ট্রি হবে। এ যোগাযোগ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন আনবে বলে আমরা মনে করি।
ভোলা-৩ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ও স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম গণমাধ্যমকে বলেন, নদীবেষ্টিত দ্বীপ জেলা ভোলার সাথে মূল ভূ-খণ্ডের যোগাযোগ স্থাপন এবং ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ সেখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি। তাই জেলার সাথে মহাসড়ক যুক্ত করার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এমন দু:সাহসিক সিদ্ধান্তকে তিনি সাধুবাদ জানান।
ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বাসস’কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রতিশ্রুতি শতভাগ পালন করার সৎ মানসিকতা রাখেন। ভোলাকে জাতীয় মহাসড়কের সাথে যুক্ত করার সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তিনি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। আগামী দিনগুলোতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে উন্নয়নের কাফেলা নিয়ে ভোলাসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলের দৃশ্যপট পাল্টে দেয়া হবে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী।
তিনি বলেন, মহাসড়কে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এতদাঞ্চলে যেমন অর্থনীতির প্রসার ঘটবে, তেমনি বিচ্ছিন্নতার গ্লানি হতে মুক্ত হবে ভোলার ২২ লাখ মানুষ।
তিনি বলেন, তারেক রহমান সরকার আগামী দিনগুলোতে উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাবেন।
সড়ক ও জনপদ বিভাগ ভোলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে নতুন করে সাড়ে ২১ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে।
সড়ক বিভাগ কনসালট্যান্ট নিয়োগের মাধ্যমে এটির সম্ভাব্যতা যাচাই করে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। এ সড়ক নির্মাণ হলে ঢাকার সাথে ভোলার দূরত্ব কমে আসবে। ভোলার অর্থনীতির দৃশ্যপট পাল্টে যাবে।
সড়কপথ সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই শেষে কাজ শেষ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভোলা জেলাটি জাতীয় মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন