প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বাংলাদেশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মশাবাহিত এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা এবং আক্রান্তের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ২৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৫০ হাজার ২০৮ জন। পরবর্তী ৭ বছর ৯ মাসে ডেঙ্গুতে ৩ হাজার ৪৬৬ জনের মৃত্যু এবং ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯১ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
অর্থাৎ, মৃত্যুর হার ১১ দশমিক ৭১ গুণ এবং আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ দশমিক ৬৬ গুণ বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১ হাজার ৮৬৮ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২০১ জন এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৬৭ হাজার ৩৬৭ জনে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, আক্রান্তের সংখ্যা কম নথিভুক্ত হওয়া, হাসপাতালে ভর্তিতে দেরি করা এবং একই ব্যক্তি বারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুস্তাক হুসাইন মন্তব্য করেন, "ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও জনকেন্দ্রিক জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি প্রয়োজন।"
তিনি আরও বলেন, এডিস মশা বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও এই মশা বংশবিস্তার করতে পারে। এমনকি ফেলে দেওয়া ছোট পাত্রের ভেতরেও এডিস মশার প্রজনন হতে পারে। বর্তমানে ডেঙ্গুর বিস্তার শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ক্রমেই গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বারবার সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একজন ব্যক্তি একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। যেসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা কম বা শূন্যের কোটায় ছিল, তারাও এখন এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা কীভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুস্তাক।
স্বল্পমেয়াদি অভিযানের পরিবর্তে কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালানোর আহ্বান জানান তিনি। যেখানে আবর্জনা, পানি জমে থাকে এবং মশার প্রজনন বেশি হয়, সেসব এলাকাকে সেই কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন। মুস্তাক বলেন, "ডেঙ্গুকে আর শুধুমাত্র মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখা উচিত না।"
ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় তিন স্তরের ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বিনা মূল্যে বা কম খরচে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ ও প্রাথমিক পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব রোগীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালের মতো মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। গুরুতর বা জটিল রোগীদের চিকিৎসা দিতে হবে মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে।
ঢাকার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, ব্যাংক ও অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পরিচালিত বিদ্যমান হাসপাতালগুলোকে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। মুস্তাক আরও মনে করেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অতিরিক্ত শয্যা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। এতে তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীরা বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, আক্রান্তের সংখ্যা কম রিপোর্ট হওয়া এবং বারবার সংক্রমণের ঘটনা ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৯ সালের পরে অধিকাংশ বছরেই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি ছিল। আগের মতো নির্দিষ্ট সময় পরপর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়া বা কমার প্রবণতা এখন আর দেখা যাচ্ছে না।
এর একটি সম্ভাব্য কারণ, ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। অনেক আক্রান্ত ব্যক্তির তথ্যই সরকারি হিসাবে আসে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক হাসপাতাল ও ক্লিনিক থাকলেও এর অল্প একটি অংশ নিয়মিত ডেঙ্গু রোগীর তথ্য জানায়। বাশার বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বা কেস ফ্যাটালিটি রেট হিসাবের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা কম রিপোর্ট করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অনেকেই গুরুতর অবস্থায় থাকেন। আবার মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘটে।
বারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়াও আরেকটি কারণ। পরবর্তী সংক্রমণে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে দুই দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ায় ক্রমেই বেশি মানুষ একবার বা একাধিকবার এতে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি শনাক্তের বাইরে থেকে যায়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন