প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের পর বিজ্ঞানীরা এখন দুর্যোগটির কারণ অনুসন্ধানের কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এ অবস্থায় সামনে এসেছে পাঁচ মাস আগে প্রকাশিত দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য। গত মার্চে প্রকাশিত ওই গবেষণাগুলোতে হিন্দু কুশ হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল এবং এর ফলে ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে এমন ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল।
কাঠমান্ডু ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হিন্দু কুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো আগের তুলনায় দ্রুত গতিতে গলছে। সহস্রাব্দের শুরু থেকে বরফ হারানোর হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ১৯৭৫ সালের পর থেকে কিছু হিমবাহের বরফের পুরুত্ব ২৭ মিটার পর্যন্ত কমেছে বলেও প্রতিবেদনে দেখা যায়।
গবেষণাগুলোতে সতর্ক করা হয়েছিল যে, হিমবাহের এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধুমাত্র পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ভবিষ্যতে ভাটির অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জীবিকার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর বিজ্ঞানীরা সেই পরিবর্তনগুলোর দিকে নজর দিচ্ছেন। গত বুধবারের আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি উচ্চ পার্বত্য এলাকায় বরফ ও পাথরের ধসের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, ৪ হাজার মিটার এবং এর বেশি উচ্চতায় যেসব এলাকায় একসময় তুষারপাত হতো, সেখানে এখন বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটছে। ভারতের দেরাদুন ভিত্তিক ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির একজন বিজ্ঞানী এনডিটিভিকে বলেন, উচ্চতার এসব এলাকায় তুষারের পরিবর্তে বৃষ্টি হওয়া এবং হিমবাহ দ্রুত পিছু হটার বিষয়টি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
মার্চের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দু কুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো তাদের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং আনুমানিক বরফ মজুদের ৯ শতাংশ হারিয়েছে।
অন্য একটি গবেষণায় ৩৮টি পর্যবেক্ষণ করা হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০০ সালের পর হিমবাহ ক্ষয়ের হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। গবেষকদের মতে, এই প্রবণতা হিমালয়ের কিছু বরফাবৃত অঞ্চলকে এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে গবেষকেরা ধারণা করছেন, কোনো উচ্চ পার্বত্য এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমে এসে ভোতে কোশি নদীর উপনদী লেন্দে খোলায় প্রবেশ করে থাকতে পারে। এতে বিপুল পরিমাণ পানি, পলি ও পাথর নিচের দিকে নেমে তীব্র স্রোত তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ইন্দোরের সহযোগী অধ্যাপক মহম্মদ ফারুক আজম বলেন, এই পরিস্থিতির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাঁর মতে, বরফের আস্তরণ কমে যাওয়া ও হিমবাহ পিছু হটার ফলে আরও বেশি পাথুরে ও অনুর্বর এলাকা উন্মুক্ত হচ্ছে। এসব এলাকা বেশি তাপ শোষণ করায় পাহাড়ের ঢাল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে তিনিও স্পষ্ট করেছেন, নেপালের এই নির্দিষ্ট দুর্যোগের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে হিমবাহ পিছু হটা ও চিরহিমায়িত অঞ্চল ক্ষয়ের কারণে বরফের আস্তরণ কমে যাওয়ার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হিন্দু কুশ হিমালয়ে মেরু অঞ্চলের বাইরে বিশ্বের অন্যতম বড় বরফের মজুদ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এই অঞ্চলে ৬৩ হাজার ৭০০টিরও বেশি হিমবাহ রয়েছে। এসব হিমবাহ এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থার উৎস এবং কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।
সংস্থাটির মার্চের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলটির অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা নির্ভর উষ্ণায়নের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
হিমবাহ ক্ষয়ের মাত্রা অবশ্য সব অঞ্চলে সমান নয়। সবচেয়ে বেশি শতাংশ আয়তন ক্ষয় হয়েছে পূর্ব হেংডুয়ান শান পর্বতমালায়। সেখানে কিছু অঞ্চল মাত্র তিন দশকে তাদের হিমবাহ এলাকার ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত হারিয়েছে।
অন্যদিকে, মোট আয়তনের হিসাবে সবচেয়ে বড় বরফ ক্ষয় হয়েছে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়। এই তিন অববাহিকায় হিন্দু কুশ হিমালয়ের ৭৪ শতাংশেরও বেশি হিমবাহ রয়েছে।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে মার্চের ওই গবেষণাগুলোর সরাসরি সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত হয়নি। তবে হিমালয়ের বরফ দ্রুত কমে যাওয়া, উচ্চ পাহাড়ে তুষারের বদলে বৃষ্টির প্রবণতা এবং পাহাড়ের ঢালের অস্থিতিশীলতা নিয়ে কয়েক মাস আগের সতর্কতাগুলো নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সূত্র:
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন