প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
টিকিট কেটেও ট্রেনের ভেতরে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাওয়া কিংবা এসি কোচে বসে থাকা যাত্রীর মাথার ওপর অন্য কারো দাঁড়িয়ে থাকার যে চেনা অস্বস্তি, তা থেকে এবার মুক্তি পেতে পারেন রেলের যাত্রীরা। নতুন রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি ট্রেনের দীর্ঘদিনের ‘ইঞ্জিন ও কোচ সংকট’ দূর করতে বড় ধরনের রূপান্তরের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে এবং ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সরকার এবার একটি বড় ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় রেলওয়েকে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তরের কথা জানান তিনি।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে রেলওয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের ঘাটতি। এ কারণে নতুন নতুন রেললাইন নির্মাণ হলেও পর্যাপ্ত ইঞ্জিন আর কোচের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে আমরা যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছি না।’ এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সংকট দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ভারত থেকে প্রায় ২০০টি ব্রডগেজ কোচ ও লোকোমোটিভ আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, এগুলো দেশে এসে পৌঁছালে ব্রডগেজ লাইনের বিদ্যমান ট্রেনের সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। তবে মিটারগেজ অঞ্চলে এখনও বড় ধরনের চাপ রয়েছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের মাধ্যমে এই চাপও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নতুন রেলপথ চালুর দিন থেকেই যেন পূর্ণাঙ্গ যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা যায়, সেভাবেই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।
সকালে ঢাকায় এসে বিকেলে ফেরা: ৫ জেলায় কমিউটার ট্রেন
রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমাতে এবং আশপাশের জেলার যোগাযোগ জোরদারে এক দারুণ উদ্যোগের কথা জানান হাবিবুর রশিদ। গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ভাঙ্গাসহ ঢাকার আশপাশের এলাকায় নতুন করে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর ফলে ঢাকার বাইরের মানুষ খুব সহজে সকালে ট্রেনে করে ঢাকায় এসে কাজ শেষ করে আবার বিকেলে নিজ গন্তব্যে ফিরে যেতে পারবেন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) এবং সিরাজগঞ্জ-বগুড়া নতুন রেললাইন প্রকল্পের কাজও সমানতালে এগিয়ে চলছে।
বেসরকারি বিনিয়োগে সচল হবে ‘ডেমু ট্রেন’
বিগত সময়ে আমদানি করা ডেমু ট্রেনগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে সরকার নতুনভাবে চিন্তা করছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিপুল অর্থ খরচ করে এগুলো মেরামতের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে রেল। এখন বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ডেমু ট্রেনগুলো সচল করার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে এবং এরইমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনাও শুরু হয়েছে। একইভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বড় বড় জংশন স্টেশনগুলোতে বেসরকারি অর্থায়নে উন্নত অপেক্ষাকক্ষ, আধুনিক যাত্রীসেবা ও বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
নতুন ট্রেনে ইন্টারনেট ও সৌরবিদ্যুৎ
প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগছে রেলের সেবায়। ভবিষ্যতে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচে যাত্রীদের জন্য ইন্টারনেট সুবিধা চালুর বিষয়ে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রেলওয়ের বিশাল পরিমাণ অব্যবহৃত জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি বিনিয়োগে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ দিয়ে প্রথমে রেলের নিজস্ব চাহিদা মেটানো হবে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করা হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংয়ে আন্ডারপাস-ওভারপাস
সারা দেশে রেলের লেভেল ক্রসিংগুলো আধুনিকায়ন ও নিরাপদ করার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। একই সঙ্গে যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত রেলক্রসিংগুলোতে আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে পুরো দেশের রেল নেটওয়ার্ককে ব্রডগেজে রূপান্তর করার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।
কমবে ‘স্ট্যান্ডিং টিকিট’-এর ভোগান্তি
আন্তঃনগর ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাতায়াতের (স্ট্যান্ডিং টিকিট) বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, সরকার এই ব্যবস্থাকে নীতিগতভাবে সমর্থন করে না। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে বাধ্য হয়ে অনেক সময় এটি করতে হয়। তবে নতুন কোচ ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হলে স্ট্যান্ডিং টিকিটের প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে আসবে।
পরিশেষে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু নতুন নতুন রেললাইন নির্মাণ করা নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত ইঞ্জিন-কোচ, উন্নত স্টেশন ও নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করে বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি বিশ্বস্ত ও সময়োপযোগী গণপরিবহনে পরিণত করা।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন