প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কামারগাঁ সরকারি খাদ্যগুদামে রাজনৈতিক পরিচয়ের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা, জুয়েল নামের, যোগসাজশে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত কৃষকরা সরকারের নির্ধারিত ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং খাদ্যগুদামে ধান দেওয়া থেকে তারা দূরে রয়েছেন। এবারের অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযানে কৃষকদের অংশগ্রহণ নেই। তাদের নাম ব্যবহার করে, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবশালী জুয়েল নামের এক নেতা ধান সংগ্রহ করছেন। খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার নেপথ্যে মদদে কৃষকের কার্ড ভাড়া নিয়ে, অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকের অজান্তে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সাধারণ কৃষক ধান দিতে গেলে আর্দ্রতাসহ নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা তাদের কৃষি কার্ড ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষক রুবেল, শহিদুল, গনেশ এবং ফারুক জানিয়েছেন যে, তারা একাধিকবার গুদামে ধান দিতে গিয়েছেন। কিন্তু তাদের ধানের আর্দ্রতা ঠিক নাই বলে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অথচ একই ধান কিনে জুয়েল গুদামে সরবরাহ করছেন। এটি অবশ্য নীতিমালা অনুযায়ী সম্ভব নয়, কেননা কার্ডধারী কৃষকদের উপস্থিতিতে ধান কেনা উচিত। তবে সিন্ডিকেট চক্র বিভিন্ন কৃষকের কার্ড ব্যবহার করে ধান সংগ্রহ করছে। এই অবস্থা আরও প্রকট হয়ে উঠছে, যেহেতু যারা ধান দিতে পারবেন না, তাদের নামও তালিকায় রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শর্ত পূরণ না করে এসব ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং স্থানীয় এলাকার পরিবর্তে বাইরের এলাকার ধান গুদামে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি, এলএসডির মাধ্যমে প্রতি টন ধানে দেড় থেকে ৩ হাজার টাকার আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। সরেজমিনে সিসি ক্যামেরা এবং কৃষকের মোবাইল নম্বর যাচাই ও গুদামে কেনা ধানের আর্দ্রতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে বলেও জানিয়েছে একাধিক সূত্র। স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, বাজারে মোটা ধানের দাম সাড়ে ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা। সেই হিসাবে সাড়ে ২৮ টাকা কেজি হিসেবে দাম পড়ে। অপরদিকে, সরকার ৩৬ টাকা প্রতি কেজি ধান ক্রয় করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে কৃষক প্রতিটি মণে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হারাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে যে পাবনা, নাটোর ও নওগাঁর বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটা ধান এনে গুদামে প্রদান করা হচ্ছে। তবে খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে এই অবৈধ কার্যক্রম চলছে। এর ফলে সরকারী সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে সাধারণ কৃষকদের মাঝে। জানা গিয়েছে, তানোরে চলতি বছরের ১৯ মে মঙ্গলবার ধান সংগ্রহের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের আওতায় ৪৯ টাকা কেজি দরে অটো ও হাস্কিং মিল থেকে মোট ৪০৬ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ৩০০ মেট্রিক টন গমের পাশাপাশি ৩৬ টাকা কেজি দরে এক হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে। এই পরিকল্পনার আওতায়, উপজেলা কামারগাঁ সরকারি খাদ্যগুদামে কামারগাঁ এবং কলমা ইউনিয়ন থেকে ৫৫৫ মেট্রিক টন ধান কেনা হবে। প্রান্তিক কৃষকদের সুবিধার্থে চলতি বোরো মৌসুমে সরকার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে, কিন্তু বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। সরকারি গুদামে তা বিক্রি করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা মণে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লাভের সুবিধা নিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় জৈষ্ঠ নেতা মন্তব্য করেছেন যে, দুঃখজনক হলেও সত্যি, কামারগাঁয়ের কিছু রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবশালী নেতা এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করছেন। তারা নিজেদের পছন্দের ইউনিয়নগুলো ভাগ করে নিজেদের বিশ্বাসভাজন লোকদের মাধ্যমে কৃষকদের ভোটার আইডি সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি করেছেন। কৃষকদের সঙ্গে যে প্রতারণা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেছেন, শুরুতে তিনি সাধারণ কৃষক ছিলেন এবং বিগত সময়ে যেসব কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের তালিকা করে ধান দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু একজন প্রভাবশালী নেতার লোভের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তিনি দলের হাইকমান্ডের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী কৃষকদের উন্নয়নে ধানের সন্তোষজনক মূল্য দিয়েছেন, কিন্তু এক শ্রেণির প্রভাবশালী তা লুটে নিচ্ছেন; ফলে সরকারের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। এ বিষয়ে উপজেলার কামারগাঁ খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) আতিকুর রহমান আতিক বলেছেন, তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ২০২৬ সালের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের আওতায় চাল ও ধান-গম ক্রয়ের অভিযান চলছে। আগামী ৩১ আগস্ট এই কার্যক্রম চলবে এবং প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকেই ধান কেনা হচ্ছে। তানোর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (টিসিএফ) পারভীন খাতুন জানিয়েছে, তিনি কোনও লিখিত অভিযোগ পাননি। তবে এই বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া হবে। কামারগাঁ ইউপির হরিপুর, ছাঐড়, মালশিরা, কচুয়া ও কাদিরপুর এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষকের সঙ্গে সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযানের বিষয়ে কথা হলে, তাদের প্রায় সবার বক্তব্য কাছাকাছি ছিল। তারা জানিয়েছে, সরকার ধান কেনে বলে শুনেছি কিন্তু কীভাবে এবং কখন ধান নেয়, সেই বিষয়ে তাদের কোনও ধারণা নেই। এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনও প্রচার চোখে পড়েনি। বেশিরভাগ কৃষক জানেন না, সরকার কত টাকা মূল্যে ধান কিনছে। সরকারি গুদামে কতটুকু পর্যন্ত ধান দেওয়ার অধিকার রয়েছে একজন কৃষকের, তা নিয়েও তাদের মধ্যে আক্ষেপ রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন