প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
উপকূলীয় জেলা বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, উপকূলীয় অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, এসব কারণে বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। অথচ বরগুনার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে উচ্চশিক্ষার জন্য জেলার বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের পরিবারগুলোকেও অতিরিক্ত আবাসন, যাতায়াত ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে হয়।
বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে আর্থিক সংকটে থাকা মেধাবী শিক্ষার্থী এবং প্রত্যন্ত এলাকার তরুণ-তরুণীদের জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণ তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। আবাসন ও যাতায়াতের ব্যয় কমলে অনেক পরিবারের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে, এটি নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
তবে বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে জেলাটি গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষ সম্ভাবনাময়। বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন উপকূল, মৎস্যসম্পদ, কৃষি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, এসব বিষয়ে গবেষণার জন্য বরগুনা হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মৎস্যবিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দুর্যোগবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হলে স্থানীয় সমস্যার বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান খোঁজার সুযোগ তৈরি হবে। এর সুফল কৃষক, জেলে ও উপকূলের দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। পাশাপাশি, গবেষণার ফলাফল জাতীয় পর্যায়ের নীতি প্রণয়নেও সহায়ক হতে পারে।
বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবাসন, পরিবহন, খাবারের দোকান, বই ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পিত অবকাঠামো, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, যোগ্য শিক্ষক, গবেষণাগার এবং মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি বাস্তবায়নের প্রশ্নে ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। ২০২৩ সালে বরগুনাসহ কয়েকটি জেলায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইউজিসির সুপারিশের কথা জানানো হয়। বর্তমানে বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ফাইল বন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক চাহিদা, জমির উপযুক্ততা, যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশগত প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপদ ও টেকসই ক্যাম্পাস স্থাপনের অংশ হিসেবে পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে।
বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা একটি একক গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয়। এখন প্রয়োজন দাবিটির বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট করা, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া এবং বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা। উপকূলের তরুণ প্রজন্মের মেধা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আর অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়।
বরগুনায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক বরগুনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোস্তফা জামান দাবির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, 'বরগুনা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, যোগাযোগ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। উপকূলীয় জেলা হওয়া সত্ত্বেও এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ, মৎস্যসম্পদ ও কৃষির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার শক্তিশালী ক্ষেত্র গড়ে তোলার সুযোগ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। এ অবস্থায় বরগুনায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয় নয়; এটি জেলার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কমানো এবং উন্নয়নের নতুন পথ তৈরির উদ্যোগ হতে পারে।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বরগুনার শিক্ষার্থীদের অন্য জেলায় যেতে হলে পরিবারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে। বরগুনায় মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে, পাশাপাশি শিক্ষক, গবেষক ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে জেলার সামগ্রিক উন্নয়নেও অবদান রাখা সম্ভব হবে।
অধ্যাপক মোস্তফা জামানের মতে, বরগুনার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মৎস্যবিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও পরিবেশবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও কৃষির সংকট নিয়ে গবেষণা হলে তার সুফল শুধু বরগুনা নয়, দেশের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকার মানুষও পাবেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, যোগ্য শিক্ষক, গবেষণাগার এবং মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন