প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বন্যার পানি নেমে গেছে, তবে কৃষকের চোখের জল শুকানোর নাম নিচ্ছে না। কক্সবাজারে প্রায় ৪৩ হাজার কৃষকের কাছে এবারের বন্যা শুধু ফসলই নষ্ট করে যায়নি, এটি তাদের জীবিকার প্রধান ভরসা কেড়ে নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলছেন, ত্রাণ নয়; জরুরি ভিত্তিতে কৃষি পুনর্বাসন প্রয়োজন। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বীজ ও চারা সহায়তা দিয়ে কৃষকদের দ্রুত আবার চাষাবাদে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারের চাঁন্দেরপাড়া এলাকার কৃষক ইসমাঈল মোহাম্মদ বলেছিলেন, তার এক বছরের স্বপ্ন ছিল। চার কানি জমিতে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পুঁইশাক, পাটশাক ও করলা সহ তিন ধরনের সবজি চাষ করেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের বন্যায় সবকিছু ভেসে গেছে। পানি নেমে গেলেও জমিতে কোমরসমান কাদামাটি রয়ে গেছে। ফলে নতুন করে চাষ শুরু করাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইসমাঈল মোহাম্মদ তার হতাশার কথা জানিয়ে বলেন, চার কানি জমিতে সবজি চাষ করতে প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ করেছিলাম। কিন্তু বন্যার জন্য পুরো ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এখন কাদামাটি জমে থাকার কারণে বুঝতে পারছি না আগে কাদা সরানো শুরু করব, নাকি নতুন করে চাষ শুরু করব। নতুন চাষের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে পাব, সেটিও আমার জানি না।
ইসমাঈলের মতোই একই সমস্যায় পড়েছেন কক্সবাজার সদর, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার হাজারো কৃষক। সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত রামু, চকরিয়া, মাতামুহুরী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি টানা বৃষ্টির কারণে এবং পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যায়। নয় দিন পর পানি নেমে গেছে, কিন্তু মাঠজুড়ে এখন নষ্ট ফসল আর অনিশ্চয়তার চিত্র রয়েছে।
চকরিয়ার কৃষক আবছার উদ্দিন বলেন, টানা বৃষ্টিতে তার প্রায় ৩ লাখ টাকার বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মাছের ঘের থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। ফলে আমি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।
মাতামুহুরী এলাকার কৃষক রুহুল কাদের জানান, বন্যায় তার বীজতলা নষ্ট হয়েছে এবং ঘরে মজুত প্রায় ১০ মণ ধানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি তার সবজির ক্ষেতও পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন তিনি কীভাবে ধার-দেনা পরিশোধ করবেন এবং সংসার চালাবেন, তা নিয়ে খুবই চিন্তিত।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, মাঠে এখনো কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা মেলেনি। তাদের দাবি, ত্রাণ নয়; দ্রুত কৃষি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক। সরকার যেন ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
রামুর মুক্তারকুল এলাকার কৃষক মফিজুর রহমান বলেন, এখনো কোনো কৃষি কর্মকর্তাকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।
আরেক কৃষক ফরিদুল আলম বলেন, আমি ত্রাণ চাই না। সরকার যদি বীজ, সার, কৃষিঋণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেয়, তাহলে আমি আবার উৎপাদনে ফিরতে পারব। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ভোগ এড়াতে কার্যকর উদ্যোগও নিতে হবে।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং কৃষকদের বীজ ও চারা সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক জানান, গত সাত থেকে আট দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে জেলায় প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। গত দুই দিনের মধ্যে পানি নেমে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আমন ধানের বীজতলা, আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং কিছু পানের বরজ।
ড. প্রামানিক আরও জানান, প্রাথমিকভাবে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ ৮০ কোটিরও বেশি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখনও আমন মৌসুমের সময় চলমান থাকায় কৃষকদের দ্রুত নতুন ধরনের বীজতলা তৈরির পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাদের আশ্বাস অনুযায়ী ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বীজ সহায়তা দেয়া হবে।
এছাড়া যাদের নিজস্বভাবে বীজতলা তৈরির সুযোগ নেই, তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে কমিউনিটি ভিত্তিক বীজতলা তৈরি করে সেখান থেকে চারা সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে বলেও জানান ড. বিমল কুমার প্রামানিক। তার মতে, এবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে কক্সবাজার জেলায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন