প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বিভিন্ন কারণে অনেক নারী সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা কিছুটা পিছিয়ে দেন। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে গর্ভধারণের সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে। বিশেষ করে মধ্য ত্রিশের পর এই সম্ভাবনা দ্রুত হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে বয়স বৃদ্ধির ফলে ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমজনিত ত্রুটির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। ফলে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে এই প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। তবে যে কোনো নারী চাইলেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে সন্তানধারণের নিশ্চয়তা পাবে, এমনটি বলা যায় না।
বয়স কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, নারীর গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় ৩০ বছর বয়সের পর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। মধ্য ত্রিশের পর এই হার আরও দ্রুত হ্রাস পায়। ৪৫ বছর বয়সের দিকে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা খুবই কমে যায়।
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ডিম্বাণুর গুণগত মানও হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমাল অস্বাভাবিকতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ফলে গর্ভধারণের সময় ভ্রূণের কিছু জিনগত বা জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ কীভাবে করা হয়?
ডিম্বাশয়ে অবস্থিত ডিম্বাণুগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকলে সেগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এজন্য প্রথমে হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে একসাথে একাধিক ডিম্বাণুকে পরিণত করে তোলা হয়। সাধারণত ৮ থেকে ১২ দিন পর নির্দিষ্ট সময়ে ডিম্বাণু সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
এই সময়ে রোগীকে ঘুমের ওষুধ বা চেতনানাশক প্রদান করা হয়। এরপর ট্রান্সভ্যাজাইনাল সনোগ্রাফি বা টিভিএস প্রোবের মাধ্যমে বিশেষ সূচের সাহায্যে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়।
সংগৃহীত ডিম্বাণু তরল নাইট্রোজেনের অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ১০ বছর বা তারও বেশি সময় ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা সম্ভব।
পরবর্তী সময়ে ওই নারী সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সংরক্ষিত ডিম্বাণু স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনা হয়। এরপর শুক্রাণুর মাধ্যমে ডিম্বাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। পরে সেই ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
কারা ডিম্বাণু সংরক্ষণ করতে পারেন?
ক্যানসারে আক্রান্ত কোনো নারীর চিকিৎসার কারণে ভবিষ্যতে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শে আগেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তানধারণের একটি সম্ভাবনা ধরে রাখার সুযোগ দিতে পারে।
এছাড়া সুস্থ কোনো নারী যদি ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে চান, তিনিও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। তবে ডিম্বাণু সংরক্ষণ তাঁর জন্য উপযুক্ত কি না, তা নির্ভর করবে বয়স, শারীরিক অবস্থা, ডিম্বাণুর মজুত ও গুণগত মানসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই কি সন্তানধারণ নিশ্চিত?
না। ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তানধারণের নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষ করে সংরক্ষিত ডিম্বাণু পরে গলিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় আনার সময় কিছু ডিম্বাণু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এরপর নিষেক ও ভ্রূণ তৈরির ক্ষেত্রে সাফল্য নিশ্চিত নয়।
এছাড়া বয়স বৃদ্ধির সাথে নারীর অন্যান্য শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপনের পরও গর্ভপাতসহ বিভিন্ন জটিলতার আশঙ্কা থাকতে পারে। ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেও ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্মগত ত্রুটি সম্পূর্ণভাবে ঠেকানো সম্ভব এমন নিশ্চয়তাও নেই।
ঝুঁকি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ডিম্বাণু সংগ্রহের আগে দেওয়া হরমোন ইনজেকশনের কারণে কারও কারও ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিনড্রোম (OHSS) হতে পারে। এতে ডিম্বাশয় ফুলে যাওয়া, শরীরে পানি জমা, পেটব্যথা, পেট ফাঁপা, বমি বমি ভাব, বমি বা পাতলা পায়খানা হতে পারে।
জটিলতা বেশি হলে দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, অনবরত বমি, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া হরমোনের প্রভাবে ডিম্বাশয় বড় ও ভারী হয়ে গেলে সেটি নিজের অক্ষের ওপর মুচড়ে যেতে পারে, যাকে ওভারিয়ান টরশন বলা হয়। এটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এমন একটি পরিস্থিতি।
ডিম্বাণু সংগ্রহের সময় যোনিপথ বা ডিম্বাশয়ের রক্তনালিতে আঘাত লাগারও আশঙ্কা থাকে। বিরল ক্ষেত্রে মূত্রথলি, অন্ত্র বা আশপাশের রক্তনালিতেও আঘাত লাগতে পারে। সংক্রমণের ঝুঁকিও পুরোপুরি বাদ যায় না।
খরচও কম নয়
ডিম্বাণু সংরক্ষণের পুরো প্রক্রিয়া তুলনামূলক ব্যয়বহুল। ডিম্বাণু সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পাশাপাশি ফ্রিজারে সংরক্ষিত ডিম্বাণুর জন্য প্রতিবছর অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
তাহলে ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি। একই সাথে যে প্রতিষ্ঠানে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে, সেখানে ডিম্বাণু সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ভবিষ্যতে ব্যবহারের প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সব মিলিয়ে মোট খরচ সম্পর্কে আগেই বিস্তারিত জেনে নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তানধারণের একটি সুযোগ ধরে রাখার প্রযুক্তি হলেও এটি কোনো নিশ্চয়তা নয়। কার জন্য এটি উপযুক্ত, কখন করা ভালো এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি কতটা, এসব সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতেই নেওয়া উচিত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন