প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
১. ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম (বীর প্রতীক) : কাজের শুরুতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত থাকা সিতারা বেগম (১৯৪৬–২০২৪) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি উল্লেখযোগ্য নারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্চের পর দেশের পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিবাহিনীর ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রমের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসক, নার্স এবং সহায়ক কর্মীদের তত্ত্বাবধানে তিনি ছিলেন অপরিসীম। চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে তিনি অসংখ্য আহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা করেন। যদিও তিনি কোনো সামরিক ইউনিটের নেতৃত্ব দেননি, তবে সামরিক চিকিৎসাসেবার কাঠামোর মধ্যে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন। এজন্য মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কার্যকর দায়িত্বে থাকা সর্বোচ্চ পর্যায়ের নারী কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। তাঁর নিষ্ঠা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে অনেক মুক্তিযোদ্ধার জীবন রক্ষা এবং মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা শক্তিশালী হয়। মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হন, যা বাংলাদেশের বীরত্বসূচক খেতাবগুলোর মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ সম্মান। স্বাধীনতার পরেও তিনি একজন চিকিৎসক হিসেবে দেশসেবায় নিয়োজিত থাকেন এবং নারী ক্ষমতায়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যান। বহুমুখী কাজে তাঁর এক প্রেসেন্স বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অগ্রগণ্য নারী নেত্রী হিসেবে তাঁকে ব্যাপকভাবে পরিচিত করেছে।
২. সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী (১৯৩৫–২০২২) একজন প্রভাবশালী নারী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে, তিনি অস্থায়ী সরকারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ ও সহায়তার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয় করেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নারীদের সংগঠিত করেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রক্ষা করেন। ভারতে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য এবং বাস্তুচ্যুত বাংলাদেশিদের মনোবল অটুট রাখতে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। যদিও তিনি সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেননি, তাঁর অসাধারণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারী নেত্রী হিসেবে পরিণত করে। স্বাধীনতার পরেও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
৩. বেগম মুশতারী শফী : বেগম মুশতারী শফী (১৯৩৮–২০২১) মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্যতম প্রধান বেসামরিক সংগঠক ছিলেন। চট্টগ্রামে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন, বেসামরিক সহায়তা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় সরবরাহ করেন, জনমত গঠন করেন এবং যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তাঁর বাসভবন স্বাধীনতাকামী কর্মী ও প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্যদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্রের কাজ করে। লেখালেখি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। যদিও তিনি কোনো সামরিক ইউনিটের নেতৃত্ব দেননি, তাঁর নির্দেশনায় বেসামরিক প্রতিরোধ আন্দোলন উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়। স্বাধীনতার পরেও তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত লেখক, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে স্বীকৃতির পক্ষে দৃঢ়ভাবে সোচ্চার ছিলেন।
৪. তারামন বিবি (বীর প্রতীক) : তিনি (১৯৫৭–২০১৮) অসাধারণ সাহসিকতার সাথে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১১ নম্বর সেক্টরে তিনি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি উত্তরাঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে সহায়তা করতে গিয়ে অসাধারণ সাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন। প্রথমে, তাঁর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি কিন্তু পরে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিক সামরিক কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন না, কিন্তু তাঁর যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ সমাজে প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নারীদের সরাসরি কার্যকরী ভূমিকা পালনের সক্ষমতা তুলে ধরেছে। আজ তিনি সাহস, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের একটি চিরস্মরণীয় প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
৫. কাকন বিবি (বীর প্রতীক) : তিনি (১৯৫০–২০২৪) ছিলেন একজন গেরিলা যোদ্ধা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রাহক। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট অঞ্চলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্য চলাচল ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর অভিযানে সহায়তা করেন এবং দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হয়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন, কিন্তু তিনি আবারও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ চালিয়ে যান। অসীম সাহসিকতা ও অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। যদিও তিনি কোনো সামরিক কমান্ডার ছিলেন না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অনিয়মিত যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এটি তাঁর অবদান প্রমাণ করে। তাঁর জীবন অসাধারণ প্রতিকূলতার মধ্যেও সাহস, দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
৬. সুফিয়া কামাল : বিখ্যাত বেগম সুফিয়া কামাল (১৯১১–১৯৯৯) ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একজন প্রধান সাংস্কৃতিক নেতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব প্রদান করেছেন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একজন কবি, সমাজসংস্কারক এবং নারী অধিকারকর্মী হিসেবে তিনি অসংখ্য বাংলাদেশিকে স্বাধীনতার সংগ্রামে অবিচল থাকতে অনুপ্রাণিত করেছেন। যদিও তিনি সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেননি, তবে জনমত গঠন এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে তাঁর প্রভাব ছিল অসামান্য। স্বাধীনতার পরেও তিনি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিঃসন্দেহে কাজ করে গেছেন এবং বাংলাদেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় জনবুদ্ধিজীবী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
৭. জাহানারা ইমাম : জাহানারা ইমাম (১৯২৯–১৯৯৪) বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তাঁর পরিবার এবং যুদ্ধকালীন ঘটনার অভিজ্ঞতা একটি ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেন, যা পরবর্তীতে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নামে প্রকাশিত হয়। এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ দলিল হিসেবে পরিচিত। যদিও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাসরি কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন না, কিন্তু তাঁর লেখনী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। স্বাধীনতার পর তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে একটি প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ইতিহাস সংরক্ষণ করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর একটি প্রধান অবদান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন