প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সরকারের পতন ঘটানোকে দেশের জন্য ‘প্রধান লক্ষ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও ইরানের সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতা ইসরাইলের রয়েছে, তবুও দেশটির সরকার উৎখাত করা কতটা সম্ভব, সে বিষয়ে বিশ্লেষকরা সংশয় প্রকাশ করেছেন।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর সমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য এসেছে। গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা এবং পেন্টাগনের প্রধান পিট হেগসেথের ইসরাইল সফরের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে ইরানে নতুন হামলা কিংবা সরকার উৎখাতের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে পারলেও কেবল বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির সরকার পতন ঘটানো সম্ভব নয়। স্থল অভিযানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ও বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হবে।
ইরানে হামলার সক্ষমতা কতটা ইসরাইলের?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানে হামলা চালানোর মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা ইসরাইলের রয়েছে। যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক আরবান কনিংহ্যাম বলেন, ইসরাইলের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুত এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা দেশটিকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা প্রদান করে। এর মাধ্যমে ইসরাইল আবারও ইরানের আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম হবে।
তবে সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা এবং একটি দেশের সরকার উৎখাত করা এক বিষয় নয়। বিমান হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা কঠিন।
তুরস্কের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক চাগলার কুরচের মতে, বিমান হামলা কোনো দেশের সামরিক সক্ষমতা কমাতে পারে, কিন্তু তার আক্রমণাত্মক সামর্থ্য সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে পারে না। আকাশপথের হামলা থেকে সুরক্ষিত গোপন ও সুদৃঢ় স্থাপনাগুলো টিকে যেতে পারে।
সরকার পতনে স্থল অভিযান কি অপরিহার্য?
ইরানের সরকার পরিবর্তনের জন্য স্থল অভিযানের প্রয়োজনীয়তাকে বিশ্লেষকরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। নেতানিয়াহুও গত মার্চে স্বীকার করেছিলেন যে, শুধুমাত্র আকাশপথে হামলা চালিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেছিলেন, এর জন্য স্থল অভিযানও প্রয়োজন।
তবে ইরানের মতো একটি বৃহৎ দেশে সেনা মোতায়েন করে দীর্ঘদিন অবস্থান করা ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। কুরচের মতে, কোনো সরকারকে উৎখাত করতে হলে শুধুমাত্র সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো যথেষ্ট নয়; বরং সেনা মোতায়েন করে কয়েক বছর সেখানে অবস্থান করার প্রস্তুতি থাকতে হবে।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা তৎপরতা ও সাইবার হামলাও ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযানের অংশ হতে পারে। তবে এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকার পতন নিশ্চিত করার মতো সুস্পষ্ট কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
ইরানের অভ্যন্তরে কুর্দি কিংবা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে সরকারবিরোধী অভিযান জোরদার করার সম্ভাবনাও সীমিত। কনিংহ্যামের মতে, কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক লড়াই চালানোর মতো সক্ষমতা নেই।
ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি
ইসরায়েলের সামরিক শক্তি বেশি হলেও ইরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র নতুন সংঘাতকে ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে। আরইউএসআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশলের মতে, ইরানের লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ও আঘাত হানার ব্যবস্থায় ক্ষয়ক্ষতি হলেও দেশটির কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এবং নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ইরানকে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিও বিমান হামলা থেকে কিছু সামরিক স্থাপনা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে। ইরানের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইসরাইলকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। এতে দেশটির প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিপরীতে, ইরান তুলনামূলক কম খরচে কিছু অস্ত্র ব্যাপক হারে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে।
ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি শুধুমাত্র ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা থাকা দেশগুলোও সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
নতুন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র কি পাশে থাকবে?
ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের সমর্থন পাওয়া অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে ইসরায়েলের একটি প্রস্তাবে ট্রাম্পের সম্মতি মেলেনি। তবে তা ভবিষ্যতে সব ধরনের সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ছাড়া ইসরাইলের জন্য ইরানের গভীরে অবস্থিত সুরক্ষিত স্থাপনায় হামলা চালানো আরও কঠিন হবে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমান থেকে ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কারবিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল। গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি এসব অস্ত্রের সমতুল্য সক্ষমতা ইসরায়েলের এককভাবে নেই বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ না নিলে ইরানও পাল্টা হামলার ক্ষেত্রে কৌশলগত হিসাব করতে পারে। ওয়াশিংটনকে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে ইসরায়েলের ভূখণ্ডকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করতে পারে তেহরান। এতে ইসরাইলকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কি সরকার পতন ঘটাতে পারবে ইসরাইল?
বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে, ইরানের সামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উৎখাত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি লক্ষ্য। প্রথমটি অর্জনের সামর্থ্য ইসরায়েলের থাকলেও দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়।
কুরচের মতে, দীর্ঘদিন সেনা মোতায়েন ও অবস্থান ছাড়া কোনো সরকারকে উৎখাত করা অত্যন্ত কঠিন। ইরানের মতো বিশাল ভূখণ্ডের দেশকে ইসরায়েলের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবসম্মত নয়। তার মূল্যায়নে, যুক্তরাষ্ট্রও আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী হবে না।
সূত্র: আলজাজিরা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন