প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ইসলামের ইতিহাসে মহান মনীষীদের অম্লান স্মৃতির আলো আজও পথভোলা মানুষকে সত্য ও সঠিক পথের দিশা দেখায়। এক অনন্য পুরুষ, কাদেরিয়া সুফি ধারার প্রতিষ্ঠাতা, প্রখ্যাত আলেম ও বড়পীর হজরত শেখ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)। বিশ্বজুড়ে সুফি অনুসারী ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে হিজরি রবিউস সানি মাসের এগারো তারিখটি ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। তবে আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মহান এই অলি ও আলেমের বর্ণাঢ্য জীবন, সুন্নাহর অনুসরণ এবং দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করাই এই দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’-এর ইতিহাস
শব্দগত দিক থেকে এটি ফারসি ভাষার দুটি শব্দের চমৎকার এক সমন্বয়। ‘ফাতিহা’-এর অর্থ দোয়া, মোনাজাত, জিয়ারত বা কোনো বুজুর্গের রুহের মাগফিরাত ও মর্যাদা কামনায় কুরআন তিলাওয়াত করে ইসালে সওয়াব করা। আর ‘ইয়াজদহম’- এটি একটি ফারসি সংখ্যাবাচক শব্দ, যার অর্থ ‘এগারো’। সুতরাং ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম বলতে এগারো-এর ফাতিহা শরিফকে বোঝায়। এই ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম শরিফ আবদুল কাদের জিলানী এর স্মরণে পালিত হয়।
হিজরি রবিউস সানি (বা রবিউল আখির) মাসের ১১তম দিনে আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। তাই প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে তাঁর অম্লান স্মরণে আয়োজিত ইসালে সওয়াব ও মোনাজাতের মাহফিলকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ বলা হয়। সে হিসেবে এ বছর ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিবসটি পালিত হবে।
আধ্যাত্মিক সাধক আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ৪৭০ হিজরিতে (১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইরানের জিলান প্রদেশের কাস্পিয়ান সমুদ্রের তীরবর্তী মনোরম এক শহরে জন্ম নেন। পিতৃসূত্রে তিনি হজরত হাসান (রা.) এবং মাতৃসূত্রে হজরত হোসাইন (রা.)-এর বংশধর ছিলেন। বাল্যকালেই উচ্চতর জ্ঞানার্জনের অদম্য তৃষ্ণা নিয়ে তিনি তৎকালীন জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু বাগদাদে গমন করেন। সেখানে শায়খ আবু জাকারিয়া তাবরিজি (রহ.)-সহ সময়ের সেরা আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও আরবি সাহিত্যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
তিনি কেবল তত্ত্বীয় সুফিসাধকই ছিলেন না; একাধারে ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ও কাব্যে ছিলেন অগাধ পণ্ডিত। একই সাথে তিনি ছিলেন হাম্বলি ও শাফেয়ি মাজহাবের শীর্ষস্থানীয় ফকিহ।
আল্লাহ তাআলা তার অনুগত ও বুজুর্গ বান্দাদের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
‘জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর অলি বা বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেন না।’ (সুরা ইউনুস: আয়াত ৬২)
সুফি দর্শনে আবদুল কাদির জিলানির অবদান বাগদাদে আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর বয়ান ও রূহানি নসিহত শোনার জন্য হাজার হাজার ব্যাকুল মানুষের সমাগম হতো। তার সুগভীর জ্ঞান, হৃদয়স্পর্শী প্রজ্ঞা ও মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠের দরসে মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার অমুসলিম স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অজস্র পথভ্রষ্ট মানুষ খুঁজে পান হিদায়েতের সরল পথ। এমনকি সুলতান নুরুদ্দিন জেনকি ও ক্রুসেডজয়ী গাজি সালাহউদ্দিন আইয়ুবির বিশেষ কয়েকজন উপদেষ্টা ও সেনাপতি সরাসরি তার দরসের ছাত্র ছিলেন।
কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সমগ্র বিশ্বে তাসাউফের সুমহান দ্বীনি সংস্কারক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সুফি ধারায় পরম আধ্যাত্মিক উচ্চ মর্যাদার কারণে তাকে ‘গাউসুল আজম’ বা ‘বড়পীর’ নামে ডাকা হয়। তার কালজয়ী গ্রন্থাবলি— ‘গুনিয়াতুত তালিবিন’, ‘ফাতহুল গাইব’, ‘আল-ফাতহুর রাব্বানি’ ও ‘কাসিদায়ে গাউসিয়া’ আজও ইসলামি আলেম সমাজ ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানপিপাসুদের পরম সম্পদ।
ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম: উদযাপন ও শরয়ি বিধান হিজরি ৫৬১ সনের ১১ রবিউস সানি (১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি) মহান এই সুফিসাধক ইরাকের বাগদাদে ইন্তেকাল করেন, সেখানেই তার মাজার শরিফ অবস্থিত।
এ দিনটিতে মুসলিম সমাজ মূলত তার পবিত্র জীবন, নিষ্কলঙ্ক চরিত্র ও ইসলামি খেদমত নিয়ে আলোচনা করে। দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও কুরআন পাঠের মাধ্যমে তার রুহের মাগফিরাত ও মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ইসালে সওয়াব করা হয়। মৃত ব্যক্তির জন্য ভালো কাজ ও সওয়াব পৌঁছানো প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ: إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার তিনটি আমল ব্যতীত বাকি সব আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়—১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, এবং ৩. এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম ৪২০৫)
তবে ওলামায়ে কেরামের মতে, এ দিনকে কেন্দ্র করে লাইটিং, আলোকসজ্জা, খামখেয়ালি বা অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতায় মেতে ওঠা ইসলামে অনুমোদন নেই। কোনো বিশেষ স্থান সাজানো বা বাহ্যিক আড়ম্বর নয়; বরং তার সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষাকে জীবনের পাথেয় বানানোই এ দিনের প্রকৃত দাবি।
বড়পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ছিলেন সততা, আমানতদারিতা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের এক অনন্য বাতিঘর। ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ পালনের আসল বার্তাটি কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে মিলাদ বা দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার মতো চারিত্রিক মাধুর্য গড়ে তোলা, সত্য কথা বলা এবং আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর প্রতি একনিষ্ঠ থেকে জীবন পরিচালনা করার মাঝেই নিহিত রয়েছে এই দিবসের প্রকৃত শিক্ষা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন