প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
একসময় বরগুনার বলেশ্বর, পায়রা ও বিষখালী নদী ছিল নানা প্রজাতির মাছের নিরাপদ আবাস। কিন্তু বর্তমানে নিয়ন্ত্রণহীন প্লাস্টিকদূষণের ভয়াবহ থাবায় বিপর্যস্ত হয়েছে এই তিন নদ-নদী। জেলা শহরসহ উপজেলা ও ইউনিয়নের বাজারগুলো থেকে প্রতিদিন অপর্যাপ্তভাবে পলিথিন, থার্মোকল, কর্কশিট ও অন্যান্য বিভিন্ন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী, খাল ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে।
এর ফলে নদীর পানি ও তলদেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং মাছের প্রাকৃতিক আবাস ও প্রজনন ক্ষেত্রে ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পর প্লাস্টিকদূষণও বর্তমানে মৎস্যসম্পদের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীতে এর বিরূপ প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জেলা প্রশাসনের তালতলী উপজেলার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র-সংলগ্ন বড় অঙ্কুজানপাড়া এলাকায় দেখা যাচ্ছে, পলিথিনসহ বিভিন্ন প্লাস্টিকের বর্জ্য নদীর তীরে লেখা হয়েছে।
এখানে বর্জ্যের বিশাল স্তূপ তৈরি হওয়ায় তা নদীর পানিতে মিশে সাগরে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এসব প্লাস্টিক বর্জ্য আটকে নদীর নাব্যতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। সাগরের মোহনায় কিছু চর পড়ে জলজ প্রাণীর চলাচলেও বাধা তৈরি হচ্ছে। শুধু তালতলী উপজেলার বড় অঙ্কুজানপাড়া নয়, বরগুনা জেলার প্রায় সকল উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নের বাজারেও প্রতিদিন একই চিত্র লক্ষ্য করা যায়। বাজারের পলিথিন, প্লাস্টিক, পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে পাশের নদী, খাল বা জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে দ্রুত নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং জলজ পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, ফলে পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে।
বরগুনা সদর পৌরসভায় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হলেও এটি এখনো পুরোপুরি চালু করা হয়নি। বাজার থেকে প্রতিদিন উৎপন্ন হওয়া বিশাল পরিমাণ বর্জ্যের একটি বড় অংশ নদীতীরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে, গত বছর পাথরঘাটা পৌরসভা নদীতীরে বর্জ্য ফেলার ঘটনায় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর কিছুদিন নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য অপসারণ করা হলেও ওই পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পৌর এলাকার বাজার এবং মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে প্রতি দিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য—পলিথিন, কর্কশিট, থার্মোকল, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের থালাবাসন এবং নানা আবর্জনা বিষখালী নদী ও আশপাশের খালে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে অন্যদিকে নদী ও খালের পানি এবং জলজ পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নদ-নদীর মৎস্যসম্পদ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
সদর উপজেলার জেলে মো. সাইফুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রথমে মৌসুমে একবার জাল ফেললেই ভালো ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে থেকেও সেই পরিমাণ মাছ পাওয়া যায় না। জালে মাছের চেয়ে পলিথিনই বেশি ওঠে।’ একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন পাথরঘাটার জেলে আবদুল মালেক। তিনি বলেছেন, ‘নদীর অনেক জায়গায় প্লাস্টিক বর্জ্য ভাসতে দেখা যায়। এতে মাছের চলাচল ও আমাদের মাছ ধরার কাজে সমস্যা হয়। আয়ও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।’ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় এখনো খোলা জায়গায় বা নদীতীরে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা আছে। কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে প্লাস্টিক ও পলিথিনের বড় অংশ নদীতে গিয়ে পড়ছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল হক বলেছেন, ‘প্লাস্টিকদূষণ বর্তমানে নদী ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য অন্যতম বড় হুমকি। নদীতে ফেলা প্লাস্টিক ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় (মাইক্রোপ্লাস্টিক) পরিণত হচ্ছে। এসব কণা প্ল্যাঙ্কটন, ছোট মাছসহ শেষ পর্যন্ত ইলিশ এবং বড় মাছের শরীরে প্রবেশ করে। এতে মাছের পরিপাকতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘকাল মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে থাকলে মাছের প্রজননক্ষমতাও কমে যেতে পারে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাছলিমা আক্তার বলেন, ‘নদীতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু নদীর পরিবেশ নয়, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করছে।’ তিনি বলেন, ‘পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নদী ও খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যেখানে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাবে, সেখানে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তাছলিমা আক্তার আরও বলেন, ‘নদী রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই সচেতন হলেই নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা আরও সহজ হবে এবং আমাদের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন