প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
হত্যার ঘটনার আগের রাত পর্যন্ত জোবায়েদ ও তার সহযোগীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। ঘটনার দিন আসলে ওই ছাত্রকে পড়াতে গৃহশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদলের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. জোবায়েদ হোসাইন। কিন্তু তিনি ওই বাসা থেকে আর জীবিত ফিরে আসেননি। প্রায় ৯ মাসের তদন্তের পর পুলিশের অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, এক মাস ধরে পরিকল্পনা করে তার হত্যা করা হয়েছে।
গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় জোবায়েদকে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। তদন্তে দেখা যায়, প্রেমের সম্পর্কের জটিলতা এবং অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই ছিল এ হত্যার মূল কারণ। নজরদারি, ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ, অস্ত্র কেনা, গতিবিধি অনুসরণসহ সব প্রস্তুতি শেষে তার হত্যা সম্পন্ন হয়।
প্রায় ৯ মাসের তদন্তের শেষে গত ৩০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফ হোসেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত হিসেবে বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৯), তার প্রেমিক মাহির রহমান (১৯) এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে (২১) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মাহির ছিলেন মূল হামলাকারী, বর্ষা হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং আয়লান ছিলেন সহযোগী। অভিযোগপত্রে ৫০ জনের সাক্ষ্যের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফরেনসিক, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আলামতের বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার ১৫ নুরবক্স লেনের রৌশান ভিলা নামের এক বাসার সিঁড়ি থেকে পুলিশ জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। ওই ভবনে তাকে বর্ষা পড়াতেন। একদিন পর মৃত জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বংশাল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
জোবায়েদ ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কুমিল্লা জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন এবং ফরাশগঞ্জে মেসে বসবাস করতেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, বর্ষা ও মাহির ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চিনতেন এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একপর্যায়ে তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বর্ষার সঙ্গে জোবায়েদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
মোবাইল ফরেনসিক বিশ্লেষণে জোবায়েদ ও বর্ষার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। পরে মাহিরের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক আবার শুরু হলে, জোবায়েদের কাছে থাকা ছবি ও ভিডিও ফাঁস হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তারা তাঁকে 'হুমকি' হিসেবে দেখছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও উঠে এসেছে, এ কারণেই গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তারা জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনায় লিপ্ত হন। এক মাস ধরে বিভিন্নভাবে পরিকল্পনা করে শেষ পর্যন্ত হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তদন্তে জানা যায়, হত্যার ৮ থেকে ৯ দিন আগে মাহির ও তাঁর বন্ধু আয়লান ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করেন। পরে দুটি সুইচ গিয়ার ছুরি কেনেন। কয়েকদিন ধরে জোবায়েদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, বর্ষা নিয়মিত জোবায়েদের টিউশনে আসা যাওয়ার তথ্য মাহিরকে জানাতেন। ১৯ অক্টোবর ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ নিজের লাইভ লোকেশন বর্ষাকে পাঠান। এই তথ্য পাওয়ার পরেই মাহির ও আয়লান হামলা চালান।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, জোবায়েদের ঘাড়ে প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা সুইচ গিয়ার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু ঘটে। ফরেনসিক প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা যায়, ছুরির আঘাতে জোবায়েদের গলার ডান পাশের ক্যারোটিড আর্টারি ও ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন ছিন্ন হয়ে যায়। উদ্ধার হওয়া ছুরিতে মাহিরের ডিএনএ পাওয়া যায়।
অভিযোগপত্রে মাহিরের দেওয়া জবানবন্দির উদ্ধৃতি রয়েছে। সেখানে মাহির বলেছেন, বর্ষা তাকে নিয়মিত জোবায়েদকে হত্যা করতে চাপ দিতেন। ধরা পড়লে কি হবে—এমন প্রশ্ন করলে বর্ষা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তাদের পরিবারে অনেক আইনজীবী আছেন।
মাহির তার জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন, ‘মারার পর ধরা পড়লে সামলাবো কেমনে—বর্ষাকে এই প্রশ্ন করলে বর্ষা উত্তর দেয়, তাঁর (বর্ষার) বাসায় অনেক অ্যাডভোকেট আছেন। কোথায় মারা যায়? এই প্রশ্নে বর্ষা জানায়, বর্ষার বাসার নিচে সুনশান নীরবতা, সেখানে মারলে সুবিধা হবে। বর্ষা আমাকে প্রতিনিয়ত মারার জন্য চাপ দিত। ঘটনার দিন ১৯ অক্টোবর বেলা ১টার দিকে বর্ষা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কখন মারবা।’
জবানবন্দি অনুযায়ী, জোবায়েদ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে বর্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মাহির ব্যাগ থেকে ছুরি বের করে আঘাত করেন। তিনি আয়লানকে ছুরি নিয়ে এগিয়ে আসতে বললে আয়লান যাননি।
তদন্তে দেখা যায়, হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় জোবায়েদ কোনোভাবে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে বর্ষার সামনে হাজির হন এবং তাকে বাঁচানোর আকুতি জানালে বর্ষা তাকে বলেন, তোর মতো পাপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত।
পুলিশের দাবি, হত্যার কয়েকদিন আগেই মাহির ও আয়লান জোবায়েদকে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন। বর্ষাকে আর না পড়ানোর জন্য সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু জোবায়েদ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আশরাফ হোসেন বলেন, হত্যার আগের রাত পর্যন্তও বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কথোপকথন ছিল। ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্ষা খুব ধূর্তভাবে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ফলে জোবায়েদ কোনোভাবে হত্যার পরিকল্পনার আভাস পাননি।
আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি ১৩ জুলাই জিআরও শাখায় পৌঁছেছে। সেই দিন যথাসময়ে উপস্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় আগামী ১২ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নতুন সময় নির্ধারণ করেছে আদালত।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক কামাল হোসেন এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। অভিযোগপত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু।
তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে দেওয়া ডিএনএ প্রতিবেদন মাহিরের সঙ্গে মিলে গেছে। এছাড়া অভিযোগপত্রে তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। মাহিরের বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেউই ছাড় পাবেন না।
অভিযুক্ত বর্ষার মা আনিকা রহমান ১৪ জুলাই বলেন, আমি আগেই বলেছি, আমার মেয়ে নির্দোষ। এখনো বলছি, আমার মেয়ে নির্দোষ।
এদিকে জোবায়েদের বড় ভাই ও মামলার বাদী এনায়েত হোসেন বলেন, অভিযোগপত্রে তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন