প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
প্রকৃত জন্মনিবন্ধনে যে কিশোরীর বয়স ১৪ বছর আট মাস, সব কিছু ঠিক থাকলে তার অষ্টম অথবা নবম শ্রেণিতে পড়ার কথা ছিল। জন্ম তারিখ ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর। জন্মনিবন্ধন আইডি নম্বর (২০১১৭৮১৬৬৫৯১০১৪২৯) এবং জন্মনিবন্ধন করা হয় ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর। তবে নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং নিবন্ধন আইডি নম্বর সব ঠিক রেখে সালটি বদলে ২০০৭ লিখে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আখতারকে ওই পরিবারের পক্ষ থেকে জন্মনিবন্ধনের একটি ফটোকপি পাঠানো হয়। সেখানে বয়স ১৮ বছর আট মাস দেখানো হয়েছে। বিষয়টি যাচাই বাছাই না করেই আর এগোয়নি। ওই অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক কিশোরীর বাবা রহিম আকন ধুমধাম করে স্থানীয় চৌকিদারের সহায়তায় বাল্যবিয়েটি সম্পন্ন করেন। পরিকল্পিতভাবে জেনেশুনেই এই বালবিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রশাসনকে মুলা ঝুলিয়ে অন্যায় কাজটি অতি সম্প্রতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের মেলাপাড়া গ্রামের ঘটনা। জনশ্রুতি রয়েছে, জন্মনিবন্ধনের ফটোকপিটি করাতে পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে চৌকিদার তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন।
কলাপাড়ায় এভাবে ভুয়া এবং জাল কাগজপত্রে অহরহ বাল্যবিয়ে হচ্ছে। কখনো প্রশাসন বন্ধ করছে, আবার কখনো আয়োজকদের কাউকে ডেকে মুচলেকা রেখে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে এর আর কোন ফলোআপ মনিটরিং নেই। ফলে সরকারের বাল্যবিয়ে বন্ধের পথটি বন্ধ হয় না। সরকারি আইনে বলা হয়েছে, যদি জন্মতারিখ পরিবর্তনের জন্য জাল কাগজপত্র তৈরি করা হয় অথবা সরকারি রেকর্ডে প্রতারণামূলক পরিবর্তন আনা হয়, তাহলে ধারা ৪৬৫ (ঋড়ৎমবৎু) জালিয়াতির জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ধারা ৪৬৬ (ঋড়ৎমবৎু ড়ভ ঢ়ঁনষরপ ৎবমরংঃবৎ) জন্মনিবন্ধন একটি সরকারি রেকর্ড। এ ধরনের রেকর্ড জাল করলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে।
এ ছাড়া বলা হয়েছে, যদি প্রমাণিত হয় যে বাবা ইচ্ছাকৃতভাবে জন্মতারিখ পরিবর্তনে মিথ্যা তথ্য অথবা জাল কাগজপত্র ব্যবহার করেছেন এবং উদ্দেশ্য ছিল মেয়েকে আইনসিদ্ধ বয়সের আগেই বিয়ে দেয়া, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭, এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির জালিয়াতি (ঋড়ৎমবৎু) সংক্রান্ত ধারা অনুযায়ী মামলা হতে পারে। পরিস্থিতিভেদে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক অথবা অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কিন্তু এর মধ্যে কোনটাই করা হয়নি।
কলাপাড়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আখতার জানান, তিনি বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় এগুচ্ছেন। তিনি আরও জানান, বাল্যবিয়ে বন্ধে তারা জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁদের দেয়া তথ্যানুযায়ী ২০২৫ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে এ বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত মোট ২৭টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করেছেন।
এ প্রতিবেদনকারীর দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলাপাড়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৭টি বিদ্যালয়ের দেয়া তথ্যানুসারে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া মোট ছাত্রী সংখ্যা ছিল ১১৬৬ জন। যারা এ বছর দশম শ্রেণিতে পড়ছে, তাঁদের সংখ্যা বর্তমানে ৭৭৭ জন। কমেছে ৩৮৯ জন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দাবি, এদের ৭০ শতাংশের বাল্যবিয়ে হয়েছে। এভাবে শতকরা ৩৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ শুধুমাত্র বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ঝরে পড়ছে অষ্টম শ্রেণিতে উর্ত্তীর্ণ হওয়ার আগেই। কারণ ষষ্ঠে অধ্যয়নরত ১১৬৬ জনের থেকে ২০২৫ সালে নবমে উর্ত্তীর্ণ হয়েছে ৯০০ জন। বাল্যবিয়ের ধকল যেন কাটানো যাচ্ছে না। কিছু বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পার হতে ঝরে পড়ছে অর্ধেকেরও বেশি। উত্তর পূর্ব পাটুয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৩৫ জন। যারা এবছর দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত রয়েছে। কিন্তু সংখ্যা কমে পৌঁছেছে ১৭ জনে। এখানে ৫১ শতাংশ ঝরে গেছে। ধুলাসার ইউনিয়নের চরচাপলী ইসালমিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০২২ সালে ষষ্ঠে ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৫৮ জন। যা বর্তমানে দশমে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ জনে। নেই ২৩ জন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলী আহম্মেদ জানিয়েছেন, শতকরা ৯৫ শতাংশের বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে লেখাপড়ার পাঠ চুকে গেছে। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ হওয়ার আগেই শিক্ষাজীবন এদের থমকে গেছে। এছাড়া যেসব ছাত্রীরা শিক্ষাজীবনে আছে, তাঁদেরও একটা অংশ বিয়ে হয়ে গেছে। মাদ্রাসায় বাল্যবিয়ের সংখ্যা আরও বেশি। এভাবে কলাপাড়ায় বাল্যবিয়ের ধকল যেন কোন কিছুতেই কাটছে না।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আরিফুজ্জামান জানান, বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। জাল কাগজপত্রে কেউ বাল্যবিয়ে সম্পন্ন করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন