প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরই প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে তিনি দলের সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভা শেষে এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ায় মির্জা ফখরুল স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আজই (বৃহস্পতিবার) নির্বাচন কমিশনে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে। প্রচলিত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল অনুযায়ী, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেল ৪টা। মনোনয়ন পত্র বাছাইয়ের দিন ১৬ আগস্ট। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে।
এদিকে, জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এটি অনেকটাই পরিষ্কার যে, মির্জা ফখরুল বাংলাদেশে ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে, যদি তিনি রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে দলের এবং সরকারের তিনটি পদ ফাঁকা হয়ে যাবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ের শান্ত জনপদ থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির উত্তাল স্রোতে ধৈর্যশীল, সংযত ও সংগ্রামী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হন। ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলার সূচনা হয়।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির ইতিহাসের দুই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের উত্তাল সময়ে তিনি প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। সেই সময়ের রাজনৈতিক চেতনা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। মির্জা ফখরুলের কর্মজীবন ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে শুরু হয়। কিন্তু মানুষকে সাহায্য করার আকাঙ্ক্ষায় তিনি বেশিদিন পেশাগত জীবনের গণ্ডিতে আটকা পড়তে পারেননি।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। জনসম্পৃক্ত রাজনীতিতে ফিরে এসে ১৯৮৮ সালে নির্বাচিত হন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও নিজের ব্যক্তিত্বের সম্মিলনে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন।
এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে—বিএনপিতে সরাসরি যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। BNP নেতৃত্বাধীন সেই সরকারের সময়ে কৃষি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরে দায়িত্ব পান বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে।
সরকারে থাকা অবস্থায় তার পরিচিতি ছিল একজন নীতিনির্ধারণে মনোযোগী রাজনীতিবিদ হিসেবে। তবে, তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় এসে উপস্থিত হয় ওয়ান ইলেভেনের সময়ে। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও কঠিন।
২০০৯ সালের পর মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও দীর্ঘ সংগ্রামের শুরু হয়। বিএনপির কাউন্সিলে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। এরপর একদিকে তৎকালীন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাস, অন্যদিকে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস—দুই কঠিন বাস্তবতার মাঝে রাজপথে বিএনপির নেতৃত্বের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেন মির্জা ফখরুল।
রাজপথের আন্দোলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, গ্রেপ্তার এবং মামলার মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। কখনো তিনি কারাগারে, কখনো আদালতের বারান্দায়, কখনো রাজপথে—দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেন তিনি।
২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। এর আগে ৫ বছর একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। দীর্ঘ এ পথচলায় বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির সাংগঠনিক সংকট, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কিংবা রাজপথের কঠিন মুহূর্ত—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকে দেখা গেছে দলের নেতৃত্বের অন্যতম মুখ হিসেবে।
মির্জা ফখরুল একজন সংবেদনশীল মানুষ। রাজনীতির রুক্ষ বাস্তবতার বাইরেও অর্থনীতি ও সাহিত্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগ রয়েছে। তার ব্যক্তিত্বে যেখানে রাজনৈতিক দৃঢ়তা রয়েছে, সেখানে মানবিকতার কোমল স্পর্শও বিদ্যমান। এই কারণেই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, প্রতিকূল দলের অনেকের কাছেও তিনি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করেছেন।
বিষণ্ণ ঠাকুরগাঁওয়ের একজন শিক্ষক থেকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতা—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই যাত্রা শুধু একটি রাজনৈতিক জীবনের গল্প নয়। এটি ধৈর্যের এবং ত্যাগের গল্প; প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সোজা দাঁড়িয়ে থাকার গল্প; এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্যেও আস্থা ধরে রাখার গল্প।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন