প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
দেশের পূর্বাঞ্চলের ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথের আখাউড়া রেলওয়ে সেকশনের অধীনে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ১৭০ কিলোমিটার রেলপথে মোট ৬ জোড়া আন্তনগর ট্রেন চলাচল করলেও, এই পথে বন্ধ রয়েছে সবধরনের লোকাল ট্রেন।
ফলে, এই পথে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো হয়ে উঠেছে লোকাল যাত্রীদের চলাচলের একমাত্র ভরসা। এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় এই পথে পাঁচটি রেলওয়ে স্টেশনসহ মোট ৬টি রেলওয়ে স্টেশন বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি হলো, এই পথে বন্ধ হওয়া লোকাল ট্রেন এবং স্টেশনগুলো আবারও চালু করা হলে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। এতে বিনা টিকেটে আন্তঃনগর ট্রেন ভ্রমণের সংখ্যা কমবে এবং সরকারের রাজস্বের পরিমাণও বেড়ে যাবে। এ কারণে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর ঘনঘন যাত্রা বিরতির সংখ্যা কমে আসবে।
সরেজমিনে ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-সিলেট রেলপথে আখাউড়া হয়ে আজমপুর থেকে, জয়ন্তিকা, কালনি, উপবন ও পারাবত সহ মোট চার জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। একইভাবে, চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের পথে উদয়ন এবং পাহাড়িকা সহ দুই জোড়া ট্রেন চলাচল করে। সব মিলিয়ে, এই পথে মোট ৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করে থাকে। তবে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে চলাচল করছে না কোনো লোকাল ট্রেন। এ অবস্থায়, এই পথে চলাচলকারী লোকাল যাত্রীদের জন্য আন্তঃনগর ট্রেনগুলোই একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দারা এবং যাত্রীরা জানান, আখাউড়া থেকে শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার অংশে, বাল্লা, কুশিয়ারা এবং সুরমা মেইলসহ বেশ Several লোকাল ট্রেন চলাচল করতো। তবে লোকসানের অজুহাত দ্বারা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ট্রেনগুলো চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলস্বরূপ, মেরাশানী, সিঙ্গারবিল, কাশিমনগর, ইটাখোলা, লস্করপুর এবং ভাতশালা রেলওয়ে স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে, এই স্টেশনগুলো পরিত্যক্ত হয়ে মুরগির ফার্ম অথবা গোয়াল ঘরে পরিণত হয়েছে। ফলে, বিনা টিকেটে আন্তঃনগর ট্রেনে যাত্রী ভ্রমণের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনিভাবে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি রয়েছে, লোকাল ট্রেনগুলো আবারও চালু হলে গ্রামাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সহজে বাজারজাত করা যাবে। অন্যদিকে, সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের আজমপুর এলাকার বাসিন্দা আবুল কাশেম ভূঁইয়া জানান, একসময় এই রেলপথে বাল্লা, কুশিয়ারা সুরমা মেইলসহ বেশ কয়েকটি লোকাল ট্রেন চলাচল করত। ফলে, স্থানীয় কৃষকসহ এলাকার বাসিন্দারা উৎপাদিত কৃষি পণ্য নিয়ে বিভিন্ন স্থানে সহজে যাতায়াত করতে পারতেন। কিন্তু লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ হওয়ার পর, স্থানীয় বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা হচ্ছে আন্তঃনগর ট্রেন।
তিনি বলেন, ‘একদিকে লোকাল ট্রেন বন্ধ, অন্যদিকে লোকাল যে রেল স্টেশনগুলো ছিল সেগুলো বন্ধ রয়েছে। ফলে, যাত্রীরা টিকিট কাটতে পারছেন না এবং তারা বিনা পয়সায় ট্রেন ভ্রমণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাই আমরা। আমি মনে করি, বর্তমান নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ব্যাপারে নজর দেবেন।’
বন্ধ হওয়া ভারত সীমান্তবর্তী সিঙ্গারবিল রেলওয়ে স্টেশনের কাছে অবস্থানরত স্থানীয় ছানাউল হক কলেজের প্রভাষক মো. ইয়াহিয়া বলেন, ‘একসময় আমরা এই সিঙ্গারবিল স্টেশন থেকে ৫ টাকা ভাড়া দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে যাতায়াত করতাম। কিন্তু এখন এগুলো শুধু স্মৃতি।’
তিনি জানান, লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ থাকার কারণে বিজয়নগর উপজেলার সাধারণ মানুষের উৎপাদিত ফল, সবজি ও কৃষি পণ্য বাড়তি ভাড়া দিয়ে পরিবহন করতে হচ্ছে। যদি লোকাল ট্রেনগুলো চলাচল করতো, তাহলে স্থানীয় কৃষকেরা অনেকটাই উপকৃত হতেন। এছাড়া, বন্ধ স্টেশনগুলো চালু থাকলে, সাধারণ মানুষও টিকিট কেটে রেল ভ্রমণ করতে পারতেন। এতে সরকারের রাজস্বের পরিমাণও বাড়ত।
মেরেশানি রেল স্টেশন এলাকার বাসিন্দা কাহার ভূঁইয়া জানান, ট্রেন এবং স্টেশনগুলো বন্ধ থাকার কারণে গ্রাম অঞ্চলের যাত্রীদের একমাত্র ভরসা এখন আন্তঃনগর ট্রেন। সাধারণ যাত্রীরা আন্তঃনগর ট্রেনে বিনা পয়সায় ভ্রমণ করে থাকেন। এটা এলাকাবাসী বাধ্য হয়েই করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আক্ষেপ করে কাহার ভূঁইয়া আরও জানান, একসময় তিনি মেরাশানী থেকে বিভিন্ন ফল নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, আশুগঞ্জ বিক্রি করতেন। বিভিন্ন সবজি নিয়ে শায়েস্তাগঞ্জ হরষপুর যেতেন। কিন্তু, এখন তাকে বাড়তি মূল্যে পিকআপ এবং সিএনজি যোগে ফল এবং সবজির ব্যবসা করতে হচ্ছে। ট্রেনগুলো চালু হলে, তিনি সহজে ফল এবং সবজি পরিবহন করতে পারতেন। এজন্য তিনি সরকারের কাছে আখাউড়া সিলেট রেলপথে লোকাল ট্রেনগুলো চালু করার দাবি জানান।
ঢাকা থেকে সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী ফারজানা ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক গতিতে ট্রেনগুলো আসে। এর কিছুক্ষণ পর, আজমপুর স্টেশনে যাত্রা বিরতী দেয়। এর মাধ্যমে আশপাশের অন্তত পাঁচটি স্টেশনে ঘন ঘন যাত্রা বিরতি দিচ্ছে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো। এতে ট্রেনের গতি যেমন কমছে, তেমনিভাবে ভ্রমণে ভোগান্তি ও অস্বস্তি বাড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই পথে লোকাল ট্রেনগুলো চালু থাকলে ঘন ঘন এত যাত্রা বিরতি দিতে হতো না। স্থানীয় বাসিন্দারা লোকাল ট্রেন না থাকার কারণেই আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর যাত্রাবিরতি দাবি করছে। আমি মনে করি, সরকারি উচ্চ পর্যায় থেকে অনুসন্ধান করে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। তাহলে এই পথে ট্রেনের যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে।’
ঢাকা থেকে সিলেটগামী পারাবত ট্রেনের যাত্রী লাবিব হাসান চৌধুরী জানান, আজমপুর থেকে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত মাত্র ৬০ কিলোমিটার অংশে অন্তত পাঁচটি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিচ্ছে ট্রেনগুলো। এতে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো যতই গতি কমছে, ততই লোকাল ট্রেনে পরিণত হচ্ছে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ নিশ্চয় করণীয় সম্পর্কে ভেবে দেখবেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে যাত্রী কল্যাণ সংগঠনের সভাপতি মো. ইব্রাহিম খান সাদাত বলেন, ‘সারা পৃথিবীর মধ্যে নিরাপদ পরিবহন হচ্ছে ট্রেন। কিন্তু আমরা স্বাধীনতার পর দেখছি, নিয়মিতভাবে ট্রেন পরিষেবাকে অবনমন করা হচ্ছে। আখাউড়া সিলেট রেলপথে লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে, স্থানীয় কৃষকরা কৃষি পণ্য বাজারজাত করতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এছাড়া, ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে চলে আসা আন্তঃনগর ট্রেনে যাত্রীরা ঘনঘন যাত্রা বিরতির কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন