প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ কয়েকজন নেতা রাজধানীর ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (আবাসিক হোটেল) দুটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে প্রায় আট মাস ধরে নানা ‘অশ্লীল-অনৈতিক কর্মকাণ্ড’ ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, হোটেলের সেই দুটি রুমে রাতভর অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিতেন এনসিপির আরও কয়েক ডজন নেতা। ফলে সেখানে দিন-রাত অবাধ আনাগোনা ছিল নারীদের। এমনকি হোটেল ভাড়া পরিশোধ না করেই তারা চলে যান বলে অভিযোগ করেছে হোটেল কর্তৃপক্ষ।
হোটেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, এনসিপির ওই পাঁচ নেতা হলেন- ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার, সাদেক মির্জা, মিরাসাত হোসেন হিমেল, শাখাওয়াত হোসেন ও তাওসীপ। উল্লেখ্য, ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সদস্য সচিব। বাকিরাও দক্ষিণের কমিটিতে বিভিন্ন পদ-পদবিতে রয়েছেন। শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আরও জানা গেছে, তিনি স্থানীয় এমপির ঘনিষ্ঠজন ছিলেন এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীতে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিবের পদ লাভ করেন। শাহরিয়ার একজন রাজনীতিবিদের ছেলে, তার বাবাও ছিলেন পতিত সরকারের যাত্রাবাড়ী এলাকার এমপি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর বিশেষ সহকারী।
জানা যাচ্ছে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পাঁচ নেতার কাছে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকার আবাসিক হোটেল ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের কাছ থেকে প্রায় ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ টাকা হোটেল ভাড়া বকেয়া রয়েছে। ভাড়া নেওয়া রুমে নারীদের অবাধ যাতায়াত করতেও দেখা গেছে। এ বিষয়টি নিয়ে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। হোটেলটির মহাব্যবস্থাপক খন্দকার রুহুল আমিনের স্বাক্ষরে এ অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই পাঁচ নেতার নেতৃত্বে কয়েক ডজন নেতা সেখানে নিয়মিত রাত্রিযাপন করতেন। নারীদের আনাগোনাসহ নানা ধরনের অশ্লীল কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এনসিপির কয়েকজন সমন্বয়ক আওয়ামী লীগ কার্যালয় সংস্কারের কাজের কথা জানিয়ে হোটেলটিতে অবস্থান নেন। পরে তারা ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় আট মাস হোটেলের ৭২৫ ও ৭২৭ নম্বর কক্ষ দুটি ব্যবহার করেন।
হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিটি কক্ষের দৈনিক ভাড়া ছিল ৩ হাজার টাকা, যার ভিত্তিতে দুই কক্ষের মোট ভাড়া দাঁড়ায় ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ টাকা। বুকিংয়ের সময় তারা ১০ হাজার টাকা অগ্রিম পরিশোধ করলেও পরবর্তী সময়ে বাকি অর্থ পরিশোধ করেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দলীয় পরিচয়ের কারণে সরল বিশ্বাসে হোটেলে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারা বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করেই হোটেল ত্যাগ করেন। পাওনা টাকা চাইলে হোটেল কর্তৃপক্ষকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, হোটেলে অবস্থানকালে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে, এবং এ সংক্রান্ত সিসিটিভি ফুটেজ তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে যদি দলীয় নেতৃত্বের সহযোগিতায় বকেয়া অর্থ আদায় সম্ভব না হয়, এবং সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরবে।
অভিযোগপত্রে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন- ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার, সাদেক মির্জা, মিরাসাত হোসেন হিমেল, শাখাওয়াত হোসেন ও তাওসীপ। উল্লেখযোগ্য যে, এই পাঁচজনের নেতৃত্বে আরও কয়েক ডজন নেতা সেখানে নিয়মিত অবস্থান করতেন।
হোটেল ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনালের হিসাব বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, এনসিপির নেতারা হোটেলে দুটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে আট মাস ছিলেন। হোটেল বুকিংয়ের সময় ১০ হাজার টাকা দিলেও পরে আরকোনো ভাড়া দেননি তারা। হোটেলে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ শনিরআখড়া, কেউ জুরাইন আবার কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তারা হোটেলে আসতেন, আড্ডা দিতেন রাতভর। তাদের সঙ্গেও লোকজন আসত। প্রায়ই তারা 'নারীদের' নিয়ে আসতেন। তাদের সঙ্গেও যারা আসতো তাদেরও 'নারীদের' নিয়ে আসতে দেখা গেছে। তারা বলতেন, 'নারী এলাওড না।' আমরা তখন বলেছি যে, আপনাদের কাজ আপনারা করুন, আমাদের কাজ আমাদের করতে দেন।
তিনি আরও জানান, বকেয়া ভাড়ার বিষয়ে তাদের সঙ্গে কয়েকবার বসেছি। তারা আমাদের ম্যানেজমেন্টকে বলেছিল টাকা আমরা দিয়ে দেবো। কবে নাগাদ দেবে তা বলেনি। প্রায়ই ভাড়া চাইতাম। তারা বিভিন্নভাবে ঘুরানোর চেষ্টা করতো। নির্বাচনের পরের দিন দেখি তারা আর নেই। পরে আমরা তালা ভেঙে রুম ক্লিন করে নতুন তালা দিয়ে রুম ভাড়া দিয়ে দিয়েছি। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য আমরা এনসিপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব বরাবর অভিযোগ করেছি।
অভিযোগের বিষয়ে এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার বলেছেন, 'হোটেলের রুম ভাড়ার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। নারী নিয়ে হোটেলে অবস্থানের প্রশ্নই আসে না। ওই ব্যক্তিটি আমি নই, তা যাচাই করার অনুরোধ জানাচ্ছি।'
তিনি আরও জানান, 'আমি জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। শিক্ষার্থীদের মারধরের যে ভিডিওটির কথা বিভিন্ন সময়ে বলা হয়, ওই ভিডিও পুরোনো, ২০২৩ সালের।'
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাদেক মির্জা গণমাধ্যমকে বলেন, 'ওই হোটেলে দুটি রুমে আমাদের কয়েকজন ছিল। তবে রুম ভাড়ার বিষয়ে আমি অবগত নই। ওই সময়ে রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় আমি দু-একবার দেখা করতে হোটেলে গিয়েছি। আন্দোলনের সময় রাত হয়ে যাওয়ায় রাতে অনেকে সেখানে থাকতো। এর বাইরে আমার কিছু জানা নেই।'
আরেক অভিযুক্ত এনসিপি নেতা শাখাওয়াত হোসেন বলেন, 'হোটেল ভাড়ার বিষয়টি আমি অবগত না। ওই রুমটি তো আমার নামে বুক করা হয়নি। যে পাঁচজনের কথা বলা হচ্ছে, তাদের মধ্যে একজন ভাড়া নিয়েছে। তিনিই হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন। আমি তাদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম এটা সত্যি। দুই রুমে কখনো পাঁচজন, সাতজন এমনকি দশজনেও থেকেছি আমরা। সঠিক তথ্য জানতে হলে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন।'
এনসিপির যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান সমন্বয়কারী মিরাসাত হোসেন হিমেল বলেন, 'আমি ওই হোটেলে গিয়েছি এমনটি মনে পড়ে না। হোটেলের কে অভিযোগ করেছেন আমাকে একটু জানান।'
অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, 'এই বিষয়ে অভিযোগ যেহেতু আসছে, সংগঠনের শৃঙ্খলা কমিটি আছে, তারা বিষয়টি দেখছেন। শৃঙ্খলা কমিটি রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরে সেই অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন