প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ভিড় জমাচ্ছেন। কিন্তু যথেষ্ট লাইফগার্ড ও নিরাপত্তার অভাবে অনেকের আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই শোকে পরিণত হচ্ছে। সাগরের প্রবল স্রোতে প্রতি বছর মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা বাড়ছেই।
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থা জানাচ্ছে, ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মাত্র দুই কিলোমিটারে লাইফগার্ড সেবা রয়েছে। অন্যদিকে, বাকি অংশে নিরাপত্তা, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা নিরাপত্তা পতাকা নেই। এর ফলে জনপ্রিয় ১৫-২০টি পয়েন্টে সমুদ্রস্নানে নেমে চরম ঝুঁকিতে পড়ছেন পর্যটকরা।
সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে সাগরে ডুবে ৭৬ জন পর্যটক মারা গেছেন। এর মধ্যে গত বছরই প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন, তবে এ সময়ে এক হাজার ২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকতের সি-গাল পয়েন্টে বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করে লাল পতাকা টাঙানো হলেও, পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বা দৃশ্যমান লাইফগার্ড দেখা যায় না। নিরাপত্তা ব্যবস্থার এমন ঘাটতির মধ্যেই অবাধে সমুদ্রে নামছেন পর্যটকরা। সী-সেফ লাইফগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র গত বছরেই এ পয়েন্টে সমুদ্রস্নানে নেমে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
লাল পতাকা থাকলেও এর গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক পর্যটকের ধারণা নেই। ফলে বড় ঢেউ এবং তীব্র স্রোতের মধ্যেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নারী-পুরুষ, এমনকি শিশু-কিশোররাও গোসল করছেন।
শরীয়তপুর থেকে আসা পর্যটক জীবন মোল্লা জানান, নিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। বান্দরবান ভ্রমণের পর কক্সবাজারে এসে গাড়ি থেকে নেমেই সরাসরি সমুদ্রে নেমে পড়েন তিনি।
মো. লিংকন নামের আরেক পর্যটক বলেন, ‘সৈকতে সতর্ক করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কোথায় নিরাপদ এবং কোথায় ঝুঁকিপূর্ণ, তা বোঝা যাচ্ছে না। লাল পতাকার অর্থ বিপজ্জনক এবং সমুদ্রে নামা নিষেধ জানলেও অনেকেই সেখানে নামছেন দেখে আমরাও নেমে পড়েছি।’
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে ইনানী। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে পর্যটকরা পাথুরে সৈকত, ইনানী জেটি বা পাতুয়ারটেকে নামেন। তাতে দেখা যায়, বালিয়াড়ি পেরিয়ে অনেকেই সমুদ্রস্নানে নেমে পড়েন, কিন্তু ইনানী সৈকতের তিনটি পয়েন্টে কোনো লাইফগার্ড সেবা নেই। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা নিরাপত্তা চিহ্নিত পতাকা তাও নেই।
ইনানীতে আসা পর্যটক শফিউল আলম জানান, কক্সবাজার থেকে আসার পথে কিছু সাইনবোর্ড চোখে পড়লেও ইনানী সৈকতের আশপাশে তেমন সতর্কবার্তা নেই। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে জোয়ার-ভাটা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং নিরাপদে সমুদ্রে নামার নির্দেশনা সংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করা জরুরি বলে জানান তিনি।
গাজীপুর থেকে আসা তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘সৈকতের এই অংশে আমরা কোথাও লাল-হলুদ সতর্কতামূলক পতাকা দেখতে পাইনি। কখন সমুদ্রে নামা নিরাপদ, আর কখন ঝুঁকিপূর্ণ এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও চোখে পড়েনি।’
ঢাকার বনানী থেকে আসা পর্যটক রোকেয়া বেগম জানান, ‘সমুদ্রে নামার সময় কিছুটা ঝুঁকি অনুভব হয়। কেননা সমুদ্রের আচরণ সম্পর্কে আমাদের মতো অনেক পর্যটকেরই ধারণা থাকে না। পর্যটকদের সচেতন করতে সৈকতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী বা লাইফগার্ড থাকা অত্যন্ত জরুরি।’
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক এলেও বিচকর্মী এবং দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। ইনানী এলাকার পর্যটন ব্যবসায়ী সিয়াম আহমেদ বলেছেন, ‘সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ২০০ থেকে ৩০০ মিটার পরপর বিচকর্মী বা লাইফগার্ড মোতায়েন থাকলে পর্যটকদের আগেই সতর্ক করা সম্ভব হতো। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসত।’
অন্য এক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, দুর্ঘটনা ঘটলে ট্যুরিস্ট পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসকে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়, তবে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিত করা যায় কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার সুপারভাইজার মো. ওসমান গনি বলেছেন, ‘আমাদের উদ্ধার সরঞ্জাম বলতে মূলত রেসকিউ টিউব এবং রেসকিউ বোর্ড রয়েছে, যা হাতে প্যাডেল করে পরিচালনা করতে হয়। সৈকতের বিস্তৃতি বেশি হওয়ার কারণে মাত্র কয়েকটি পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড সদস্য ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যটকদেরও সচেতন হতে হবে।’
ইনানী ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, ‘ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও বিকেলে হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে পর্যটকদের সতর্ক করা হয়। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ জানাই। তবে সৈকতটি অনেক বিস্তৃত হওয়ায় সার্বক্ষণিক নজরদারি সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত রেসকিউ টিম থাকলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সহজ হতো।’
সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, ‘অনেক পর্যটক গোসল করতে নেমে নিরাপদ সীমার বাইরে চলে যান। জোয়ার-ভাটার স্রোতে পড়ে তারা বিপদের মুখে পড়েন। বর্তমানে একটি বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে ২৭ সদস্যের লাইফগার্ড দল কাজ করছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই জনবল বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, লাইফগার্ড সেবার মানোন্নয়নে সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন