প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
আট দশকেরও বেশি সময় পরেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। যুদ্ধ ও শান্তি, উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবাধিকারসহ সমকালীন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময়ের ক্ষেত্রে এ পরিষদের গুরুত্ব এখনো অটুট রয়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি বিষয়ক পরিচালক রিচার্ড গোয়ান জাতিসংঘের কার্যক্রম, এর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন সামনে রেখে তিনি ইউএন নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চ হিসেবে সাধারণ পরিষদের গুরুত্ব এবং পরিবর্তনশীল ও বিভক্ত বিশ্বে এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
নিউইয়র্ক থেকে ইউএননিউজ জানায়, ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় সাধারণ পরিষদের ভূমিকা সম্পর্কে গোয়ান বলেন, প্রতিষ্ঠাতারা ধারণা করেছিলেন যে নিরাপত্তা পরিষদই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু হবে।
তবে জাতিসংঘের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর নিরাপত্তা পরিষদের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে দ্রুত বিভাজন দেখা দেয়। এর ফলে অনেক রাজনৈতিক আলোচনা সাধারণ পরিষদে স্থানান্তরিত হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৪০-এর দশক ও ১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও কোরিয়া পরিস্থিতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ পরিষদ মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। শীতল যুদ্ধের উত্তেজনায় নিরাপত্তা পরিষদ প্রায়ই অচলাবস্থায় পড়ত।
গোয়ান বলেন, শীতল যুদ্ধের সময় নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অচলাবস্থা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই সমর্থনের জন্য সাধারণ পরিষদের দ্বারস্থ হতো।
কোরীয় যুদ্ধ নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা অসম্ভব হয়ে পড়লে সাধারণ পরিষদই কোরিয়া পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে আলোচনা পরিচালনা করে।
১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট ও হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত আক্রমণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময় সাধারণ পরিষদ সুয়েজ সংকটের অবসানে সহায়তার জন্য জাতিসংঘের প্রথম সামরিক শান্তিরক্ষা অভিযান পরিচালনার অনুমোদন দেয়। শীতল যুদ্ধের সময় সংকট ব্যবস্থাপনায় এটি ছিল সাধারণ পরিষদের অন্যতম বড় অবদান।
১৯৬০-এর দশকে সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর জাতিসংঘে যোগদানের ফলে সাধারণ পরিষদের সদস্যসংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। গোয়ান বলেন, প্রতিষ্ঠাতারা হয়তো ধারণা করেছিলেন যে সাধারণ পরিষদের সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮০ বা ৯০টি হতে পারে। কিন্তু নতুন স্বাধীন দেশগুলো সাধারণ পরিষদকে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে।
তিনি বলেন, ১৯৬০-এর দশকে সাধারণ পরিষদ দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী অ্যাপারথাইড ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭০-এর দশকে অ্যাপারথাইডপন্থী দক্ষিণ আফ্রিকার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে গোয়ান বলেন, এসব দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপারথাইড, আফ্রিকায় পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের অব্যাহত উপস্থিতি এবং ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে সাধারণ পরিষদকে ব্যবহার করে। একই সঙ্গে তারা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়েও সরব হয়।
তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে সাধারণ পরিষদ উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য আরও ন্যায়সংগত একটি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর ফলে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকজুড়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে কঠিন কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সাধারণ পরিষদ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়া দেশগুলোর জন্য বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার প্রধান প্ল্যাটফর্ম ছিল উল্লেখ করে গোয়ান বলেন, অ্যাপারথাইডবিরোধী আন্দোলন বৈশ্বিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে অ্যাপারথাইডের পতনে অবদান রাখে।
তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদ না থাকলে জাতিসংঘের বিপুলসংখ্যক সদস্যরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেত না। যদিও বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য আরও ন্যায়সংগত কোনো নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি, তবু সাধারণ পরিষদ বহু দেশকে বিশ্বপরিসরে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে।
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের প্রসঙ্গে গোয়ান বলেন, ওই সময়ে কূটনীতিকরা তাঁদের আদর্শগত মতপার্থক্য কিছুটা পাশে রেখে জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আরও গঠনমূলক আলোচনা করতে সক্ষম হন। এ সময় যোগাযোগ ও সহযোগিতার নতুন পরিবেশ তৈরি হয় এবং জাতিসংঘের শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের মতো নতুন উদ্যোগ গড়ে ওঠে। কমিশনটি ২০০৫ সালে অনুমোদিত হয়।
২০০৮ ও ২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতিসংঘের অনেক সদস্যরাষ্ট্র মনে করেছিল, সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের ভূমিকা থাকা উচিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রধান অর্থনীতি জি-২০-এর মাধ্যমে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সমালোচনা দেখা দেয়।
তবে গোয়ান বলেন, ওই সময় পরিবেশ ও পৃথিবী রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় এর প্রতিষ্ঠাতারা যে ধারণা পোষণ করেছিলেন, সাধারণ পরিষদের বর্তমান ভূমিকা তার চেয়ে ভিন্ন উল্লেখ করে গোয়ান বলেন, প্রতিষ্ঠাতারা মনে করেছিলেন, জাতিসংঘের ব্যবস্থা পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী কাঠামো টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে জাতিসংঘ, বিশেষ করে সাধারণ পরিষদ, দেশগুলোকে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা, বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়ে কথা বলা এবং ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ করে দেয়।
তিনি বলেন, ঔপনিবেশিকতামুক্তির ইতিহাসে সাধারণ পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় উপস্থিত উইনস্টন চার্চিলের মতো কেউ যদি জানতে পারতেন যে সাধারণ পরিষদ এ ধরনের ভূমিকা পালন করবে, তাহলে তিনি বিস্মিত হতেন।
আজকের বিশ্বে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তর রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে গোয়ান বলেন, বিশ্বে জি-৭, ব্রিকসসহ অনেক কূটনৈতিক জোট ও ফোরাম থাকলেও বহু ছোট দেশ ও মধ্যম শক্তির দেশের জন্য সাধারণ পরিষদ এখনো প্রধান মঞ্চ। বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য এটিই তাদের প্রধান প্ল্যাটফর্ম।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে—এমন কথা প্রায়ই শোনা গেলেও প্রতি সেপ্টেম্বরেই সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার জন্য রেকর্ডসংখ্যক বিশ্বনেতা সমবেত হন।
গোয়ান বলেন, ‘এটি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বিশ্ব যখন কোনো জরুরি সংকটে প্রতিক্রিয়া জানাতে চায়, তখন সাধারণ পরিষদেই আসে। এর কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি আরও বলেন, সাধারণ পরিষদকে অন্য কোনো শহরে স্থানান্তর করা সম্ভব হলেও বিশ্বের বহু নেতার কাছে নিউইয়র্কে এ সংস্থার সদর দপ্তর থাকার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, এখানে তারা বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রস্থলে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন