প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
পরিচ্ছন্ন নগরীর প্রত্যাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগের মাধ্যমে। তবে, হকারদের জীবিকা, ক্রেতাদের প্রয়োজন এবং নগরীর শৃঙ্খলা - এই তিনটি বিষয় সমন্বয় করা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংপুর সফরের প্রেক্ষাপটে নগরী নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছিল। সড়ক ও ফুটপাত পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগের ফলে নগরীর পরিচিত দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে হকারদের দখলে থাকা ফুটপাতগুলোকে দখলমুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সফর শেষ হওয়ার পরও এই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার উদ্যোগ নগরবাসীর মধ্যে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে- রংপুর কি সত্যিই হকারমুক্ত, পরিচ্ছন্ন নগরীর পথে এগোচ্ছে, নাকি এই পরিবর্তন কেবল বিশেষ উপলক্ষকেন্দ্রিক?
প্রধানমন্ত্রীর সফরের চার দিন পরেও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। রংপুর সিটি করপোরেশন, মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং জেলা প্রশাসন একত্রে কাজ করছে। অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে দোকান না বসানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে। নগরীর পরিচ্ছন্নতা এবং পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ফুটপাত পথচারীদের জন্য, সেখানে দোকান বসালে বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং প্রতিবন্ধীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় পথচারীদের মূল সড়কে নামতে বাধ্য হতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং যানজট সৃষ্টি হয়।
তবে, নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখার এই উদ্যোগের আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। ফুটপাতের ছোট দোকানগুলো অনেক মানুষের জীবিকার উৎস। পুঁজি কম, স্থায়ী দোকান ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য নেই এমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকে ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করে পরিবার চালান। অন্যদিকে, নগরীর নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের একটি অংশও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য এসব দোকানের ওপর নির্ভরশীল। তুলনামূলক কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন জানিয়েছেন যে, নগরী পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে তাদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণের কথা তিনি বলেছেন। তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে, পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে তিনি বদ্ধপরিকর।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পরিচ্ছন্নতা এবং জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে, এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নির্ধারিত সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণ।
প্রথমত, নগরীতে প্রকৃত হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। কারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন, কারা সম্পূর্ণভাবে এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল এবং কারা অন্য কোথাও ব্যবসা পরিচালনার সামর্থ্য রাখেন, তা যাচাই করা জরুরি। এই তালিকার ভিত্তিতে তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবসাস্থল নির্ধারণ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নগরীর উপযুক্ত স্থানে নির্দিষ্ট হকার জোন বা ক্ষুদ্র ব্যবসার বাজার গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে স্বল্প ভাড়ায় দোকান বসানোর সুযোগ, নির্ধারিত ব্যবসার সময় এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার নিয়ম থাকবে। জায়গার সংকট থাকলে মানুষের চলাচল ও যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে। তবে বিকল্প স্থান এমন হতে হবে, যেখানে ক্রেতাদের যাতায়াত রয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা বাস্তবে বিক্রির সুযোগ পান।
তৃতীয়ত, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, স্থায়ী দোকানমালিক কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ফুটপাত দখল করে রাখলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ক্ষুদ্র হকারদের উচ্ছেদ করে অন্যদের দখল বজায় থাকলে নগরবাসীর কাছে উদ্যোগটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
চতুর্থত, নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ কোনো সফর, উৎসব কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনকে কেন্দ্র করে ফুটপাত পরিষ্কার করা এবং পরে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, এমন চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য সিটি করপোরেশন, পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে স্থায়ী তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকলে ফুটপাত পুনর্দখলের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হকারদের প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পথচারীদের অধিকার এবং নগরীর শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। কারণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা কোনো সাময়িক সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও নিরাপদ চলাচলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
রংপুরের সামনে এখন সুযোগ প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে তৈরি হওয়া পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগকে স্থায়ী নগর ব্যবস্থাপনায় রূপ দেওয়ার। এর জন্য শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, প্রয়োজন বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। যদিও সিটি প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডনের নগর পরিচ্ছন্নতার এ কার্যক্রম টেকসই করতে নেয়া নানা পরিকল্পনা দীর্ঘ সময়ের অব্যবস্থাপনা ভেঙে নতুন রংপুরে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন