প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবার (বালক)-এ বেড়ে ওঠা পাঁচ এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠান ছাড়তে হলো, কারণ তারা ১৮ বছরে পা দিয়েছে।
এদের কেউ এইচএসসি আবার কেউ অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। আবার কেউ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। আশ্রয় হারিয়ে চরম দিশেহারা এখন ওই পাঁচ কিশোর।
পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারিভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এক বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর আকাশ ইসলাম দাদা-দাদির কাছে বড় হয়। মা ছেড়ে যাওয়ায় চার বছর বয়সে ২০০৭ সালের অক্টোবর মাসে ফুফু তাকে কুষ্টিয়া শিশু পরিবারে (বালক) ভর্তি করে দেন। ২০২১ সালে এসএসসি ও ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করে বর্তমানে সে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। ২৭ জুলাই শুরু হবে প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা। ১৮ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় কদিন আগেই তাকেসহ পাঁচজনকে প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সোমবার ওই পাঁচ কিশোরকে শিশু পরিবার ছেড়ে যেতে হয়েছে। আশ্রয় হারিয়ে তাদের সবার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। হতাশা এবং মানিয়ে নেওয়ার কষ্ট বুকে নিয়ে সবাই আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
আকাশের দাদা মারা গেছেন। দাদি জীবিত আছেন, তাও অসুস্থ। বেশিরভাগ সময় অন্যত্র ফুফু বাড়ি থাকেন। আপাতত সে সেখানেই গিয়ে উঠবে। আকাশ ইসলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম লাহিনীপাড়ার মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে।
জীবনের গল্পটা এক না হলেও অনেকটা কাছাকাছি শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা একই এলাকার আকাশ শেখেরও। ২০১১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর দারিদ্রতার কারণে তাকে দু:সম্পর্কের বেশ কয়েকটি শিশু পরিবারে রেখে যান। ২০২১ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৪.৮৯ এবং ২০২৩ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৪.০০ পেয়ে এখন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে। আগামী ২৭ জুলাই তারও প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার ঠিক আগে সে কোথায় যাবে, কীভাবে পড়াশোনা করবে-তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছে আকাশ শেখ। ইতোমধ্যে পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। সংসারে মা ও বড় ভাই আছেন। ভাই ভাঙারি ব্যবসা করে কোন রকমে সংসার চালান। তাই পড়াশোনা এবং ভবিষ্যত নিয়ে আকাশ চরম দুশ্চিন্তায়।
তাদের দু’জনের মতো শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা তুষার আহাম্মেদ, আলফাজ হোসেন এবং অভি হাসানের বয়সও ১৮ বছর পেরিয়েছে। ১৮ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় তারাও প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছে। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে, পারিবারিক দারিদ্রতা, স্বজনদের অক্ষমতা কিংবা মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের মতো নানা কারণে তারা সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় এখানে থেকেই তারা পড়াশোনা চালিয়ে আসছিল। আশ্রয় হারানোয় দিশেহারা এই পাঁচ শিক্ষার্থী। পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি তাদের।
এদের মধ্যে সবথেকে বেশি উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে আলফাজ হোসেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর পর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। এরপর ২০১২ সালে শিশু পরিবারে আমাকে ভর্তি করা হয়। আর্থিক অভাবে এক বছর কলেজে ভর্তি হতে না পারলেও বর্তমানে আমি এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছি। আমাকে রাখার মতো স্থায়ী কোনো জায়গা নেই। অন্তত এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত এখানে থাকতে পারলে পড়াশোনা শেষ করতে পারতাম।
তিনি আরো বলেন, আমার মা ভাই-ভাবির সাথে শহরের হাউজিং এলাকায় সরকারি জায়গায় বসবাস করে। আমার ভাইয়ের সংসারই ভালোভাবে চলে না। তার ওপর মা থাকে। আমি আবার কিভাবে গিয়ে সেখানে উঠবো। কর্তৃপক্ষের কাছে আমি সাহায্য চেয়েছি, কিন্তু আসলে কোন কাজ হয়নি। এখন কি করবো, কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না।
তুষার আহাম্মেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে শিশু পরিবারে আশ্রয় পেয়েছিলাম। বর্তমানে আমি এইচএসসিতে অধ্যয়নরত। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি নিতে চাই। কিন্তু এখন আশ্রয় হারিয়ে শঙ্কায় আমার সেই স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অভি হাসানও একই ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরে জানায়, নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে তার পক্ষে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ১৮ বছর পূর্ণ হলেই একজন এতিম বা অসহায় তরুণ স্বাবলম্বী হয়ে যায় না। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই আশ্রয় হারালে তাদের শিক্ষা ও কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবার (বালক)- এর দায়িত্বপ্রাপ্ত হল সুপার ও অতিরিক্ত উপ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ১৮ বছরে পা রাখায় সোমবার তাদের পাঁচজনকেই পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।
পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায়। অভি নামের একজনের বাড়ি পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহ জেলায় এবং আলফাজ হোসেন নামের অপর শিক্ষার্থীর বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকায়।
এদের মধ্যে দুজনকে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এককালীন ৩০ হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি দেয়া হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে পড়া অভি নামের একজনকে ১২ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তি দেয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল লতিফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত তাদের লালন-পালনের দায়িত্ব থাকে। তাই তাদের শিশু পরিবার (বালক) ছাড়তে হবে। এর বাইরে আমাদের করণীয় খুবই সীমিত। তবে তারা যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। এই পাঁচজনের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি। সাময়িকভাবে যাতে সমস্যায় না পড়ে এজন্য আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। যদি কর্মসংস্থানের জন্যও সহযোগিতা করা হবে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো: তৌহিদ-বিন হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। ইতোমধ্যেই ওই পাঁচ শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাদেরকে কিভাবে-কতটুকু সহযোগিতা করা যায় সে বিষয়ে কাজ চলছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন