প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় নানা সংকটে ভুগছে, যার মধ্যে আবাসন, শিক্ষক ও পরিবহন সমস্যাও রয়েছে। প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পরেও ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী এখনও আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। শিক্ষকদের অনুমোদিত পদের প্রায় ৫৪ শতাংশ খালি রয়েছে। চিকিৎসাকেন্দ্রেও সেবার অভাব রয়েছে। তবে উপাচার্য জানিয়েছেন, সংকট সমাধানে তারা কাজ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।
দুই বছর আগে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন রংপুরের হান্নান ও জামালপুরের সায়েম। দীর্ঘ সময় পার হলেও তাদের হলের সিট মেলেনি। ফলে তারা ক্যাম্পাস থেকে এক কিলোমিটার দূরের মেসে বসবাস করছেন এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মতো একই পরিস্থিতিতে রয়েছে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী। কারণ শিক্ষার্থীদের ৭১ শতাংশই আবাসন সুবিধার বাইরে রয়েছে।
নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের ছাত্র আব্দুল হান্নান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকলে মাসে ১৫০ টাকার মতো ভাড়া দিতে হতো। মেসে থাকায় অনেক ভাড়া দিতে হচ্ছে। ক্যাম্পাসের কাছাকাছি মেসগুলোতে ভাড়া দিতে হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। তাছাড়া খাবার খরচ তো রয়েছেই। এখন খরচ বহন করতে পারি না বলে দূরের মেসে ৮০০ টাকা ভাড়ায় থাকি। সব মিলিয়ে ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বাবা একজন কৃষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও বাবার কাছে মাসে মাসে টাকা আনতে চাই না। সেজন্য টিউশনি করি ও কোচিংয়ে ক্লাস নিয়ে খরচ যোগাই। হলে থাকলে এই সময়টা পড়াশোনাতেই দিতে পারতাম।”
ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী সায়েম হাসান জানান, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রত্যেকেরই প্রত্যাশা থাকে হলে থাকার। আমাদের দ্বিতীয় বর্ষ শেষ হতে চলেছে এখনও হলে সিট পাইনি। হলে সিট পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এতে পরিবারের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।”
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২০০৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ২৫টি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৯ হাজার ৮১৪ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৪ হাজার ৮০৫ এবং ছাত্রী ৫ হাজার ৯ জন। চারটি আবাসিক হলে আসন সংখ্যা ২ হাজার ৮৫৯টি। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২৯.১ শতাংশ হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। আবাসন সুবিধার বাইরে রয়েছেন ৬ হাজার ৯৫৫ জন, যা প্রায় ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।
চার হলের মধ্যে দুটি ছাত্র হলে আসন ১ হাজার ৪৮৪টি। ‘বিদ্রোহী’ হলে ১ হাজার ২৮৪ আসনের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ২৫০ জন অবস্থান করছেন। ‘অগ্নিবীণা’ হলে ২১৪ আসনের বিপরীতে ১৫০ জন রয়েছেন। দুটি ছাত্রী হলে আসন ১ হাজার ৩৭৫টি। ‘শিউলিমালা’ হলে ১ হাজার ১৭৫টি আসন পূর্ণ এবং ‘দোলনচাঁপা’ হলে ২১৪ আসনের বিপরীতে ১৯০ জন অবস্থান করছেন।
আবাসিক হলেও নেই স্বস্তিকর পরিবেশ
বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্নিবীণা হল পরিদর্শন করে দেখা গেছে, প্রতিটি ছোট্ট কক্ষে চারজন করে শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। সেখানে কোনো সিলিং ফ্যান নেই; তীব্র গরমে সবাই বিছানার পাশে ছোট ফ্যান নিয়ে পার করছেন। নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার বল্লী গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান লাদেন মিয়া বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের আসনসংখ্যা খুবই কম। তাই ছোট একটি কক্ষে চারজন করে থাকতে হচ্ছে। গাদাগাদি করে থাকতে হয়, জায়গার সংকট হয়। ধুলা-বালুর সমস্যাও আছে। অনেক কক্ষের বৈদ্যুতিক সুইচ ঠিকমতো কাজ করে না।”
তিনি আরও জানান, “ওয়াশরুমেরও সমস্যা আছে। নিচতলার বেশ কয়েকটি ওয়াশরুম অচল। ওপরের কিছু ওয়াশরুম চালু থাকলেও, পুরোপুরি সচল নয়। ফলে অনেক সময় সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিশেষ করে শুক্রবার জুমার সময় গোসলের জন্য ওয়াশরুমের সামনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।”
নতুন দুটি হলের নির্মাণ কাজ শেষ হচ্ছে না
আবাসন সংকট কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ১০ তলা করে দুটি নতুন আবাসিক হল নির্মাণ করা হচ্ছে। একটি ছাত্রদের জন্য এবং অন্যটি ছাত্রীদের জন্য। প্রতিটি হলে ৮৫০ জন করে মোট ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে।
২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ছাত্র হলটির চুক্তিমূল্য ৭২ কোটি ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৪ টাকা এবং ছাত্রী হলটির ৭০ কোটি ৭৬ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ টাকা। প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হলেও ২০২২ সালের নভেম্বরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মূল কাজের চুক্তি হয়। ‘সিএসআই কনস্ট্রাকশন’ ও ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই নির্মাণকাজ করছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তিন দফায় সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটিতে শুরুতে ৪৯১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও তা পরে বাড়িয়ে ৮৪০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দ মোফাসসেরুল ইসলাম বলেন, “এ বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের সময় শেষ। এটি আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। ছাত্রাবাসের কাজও প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে, কিছু টুকিটাকি কাজ বাকি আছে।” প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, পরবর্তীতে অনেক নতুন কাজ যুক্ত হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, “দুটি হল সেপ্টেম্বরের হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু কিছু কাজ বাকি থাকায় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছে হস্তান্তর করতে পারিনি। তাদেরকে ডেকে বলেছি ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করে হল হস্তান্তর করতে। এই দুটি হল চালু হলে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে। এতে আবাসন সংকট অনেকটাই কমে যাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন