প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
১৬ জুলাই বাংলাদেশে আন্দোলন শুরু হয় এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে। ওইদিন পুলিশের গুলি লেগে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে যে দৃশ্য আবু সাঈদের মৃত্যু ঘটেছিল, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ছাত্রনেতাদের মতে, ১৬ জুলাই থেকেই আন্দোলন নতুন গতি পায়। সেদিন সারাদেশে ছাত্রলীগ এবং পুলিশের হামলায় ৬ জন নিহত হন, এবং কয়েকশ শিক্ষার্থী আহত হন। ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যে ছাত্র সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তিনি বলেন, 'রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে? সেটা আমার প্রশ্ন। দেশবাসীর কাছেও প্রশ্ন। যে রাজাকার নাতিপুতিরা সবকিছু পাবে, মুক্তিযোদ্ধারা পাবে না।' উক্ত বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে রাত থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়। একপর্যায়ে মধ্যরাতে হলের গেট ভেঙে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। ছাত্রলীগের বাধা উপেক্ষা করে মেয়েরা হলের তালা ভেঙে আন্দোলনে যুক্ত হন। শেখ হাসিনার সেই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে ক্যাম্পাসজুড়ে স্লোগান ওঠে। সেদিনই প্রথম রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহার করা হয় এবং শেখ হাসিনাকে 'স্বৈরাচার' আখ্যা দেয় শিক্ষার্থী সমাজ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের একটি দলের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিল একটি স্লোগান তৈরি করার জন্য, যাতে শেখ হাসিনাকে 'স্বৈরাচার' হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। তৎকালীন জিয়া হল ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সমন্বয় কমিটির সহ-সমন্বয়ক রিজভী আলম রাজু প্রথম স্লোগান দেন-‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার। কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’ এরপর আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিতে শুরু করে আওয়ামী লীগ। ১৫ জুলাই সকালে ছাত্রলীগ ও সরকারের মন্ত্রীরা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেছিলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে রাজাকার যারা হতে যাবে, তাদের কোনো দাবি মানা হবে না।' সেদিন দুপুর থেকে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের খুঁজতে থাকে। বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে হামলা চালানো হয় এবং বিভিন্ন স্থানে গুলিও ছোড়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। ইসলামী ছাত্র শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ জানান, হাসপাতালে হামলার ঘটনায় জড়িতদের প্রতিরোধের পরিকল্পনা হয়েছে। সে অনুসারে ঢাকার কয়েকটি এলাকায় হামলাকারীদের ধাওয়া দিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ১৫ জুলাই রাতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হয়ে ওঠে। ওই রাতেই বিভিন্ন হল থেকে ছাত্রলীগের কর্মীদের বের করে দেওয়া হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মতে, সেদিন থেকেই আন্দোলন নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন সরকার বলেন, নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর সব বাধা ভেঙে যায়। ওই রাতেই প্রতিটি হলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাত্রলীগকে হলগুলো থেকে চূড়ান্তভাবে বিতাড়িত করা হয়। ১৬ জুলাই সকালে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ শুরু হয়। অধিকার আদায়ের দাবিতে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে যান রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু সাঈদ। বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আবু সাঈদ। একই দিনে চট্টগ্রামে নিহত হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। তাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন রাজধানীর সায়েন্সল্যাব ও নিউমার্কেট এলাকায় আবারও হামলা করে ছাত্রলীগ। মূলত ১৬ জুলাই আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। সেদিনই সারাদেশে ৬ জন নিহত হন। ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলেন, আবু সাঈদ এবং ওয়াসিম আকরামের মৃত্যু আন্দোলনে নতুন গতি আনে। এরপর আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদ হোসেন বলেন, আবু সাঈদের আত্মত্যাগ এবং দুই হাত প্রসারিত করে গুলির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আন্দোলনের একটি প্রতীকী মুহূর্তে পরিণত হয়। এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব রিফাত রশিদ বলেন, আবু সাঈদ ও ওয়াসিম আকরামের মৃত্যুর খবর একসঙ্গে পাওয়ার পর তারা বুঝতে পারি, আন্দোলন আর শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সামনে আরও বড় পরিসরে ভাবতে হবে। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ১৫ জুলাইয়ের ঘটনার ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই থেকেই মূল গণঅভ্যুত্থানের গতি শুরু হয়। এদিকে, ১৬ জুলাই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একটি প্রজ্ঞাপনে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন