প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
নিরাপত্তাহীনতা, দুর্যোগের পূর্ব সতর্কতা না পাওয়া, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং অন্য দেশের জলসীমায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে খুলনা অঞ্চলের হাজারো জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। নৌযান বিকল হলে দ্রুত উদ্ধার না পাওয়া কিংবা প্রত্যাশিত মাছ না মিললে ঋণ পরিশোধের চাপ তাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। অতএব, প্রতিটি সমুদ্রযাত্রা তাদের কাছে শুধু জীবিকা অর্জন নয়, বরং নিরাপদে ঘরে ফেরারও একটি লড়াই।
আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ১২টার পর, অর্থাৎ ৩০ অক্টোবরের শুরু থেকেই মাছ ধরতে সমুদ্রে যাত্রা করবেন জেলেরা। এ জন্য খুলনার উপকূলীয় জেলেপল্লীগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
পাইকগাছার মাহমুদকাঠি, বোয়ালিয়া, হেতামপুর, কাটাখালীসহ বিভিন্ন জেলেপল্লীতে এখন ব্যস্ত সময় কাটছে জেলেদের। কেউ নৌকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করছেন, কেউ পরীক্ষা করছেন ইঞ্জিন। কোথাও চলছে নতুন জাল বোনা, আবার কোথাও পুরোনো জাল মেরামতের কাজ। পাশাপাশি সংগ্রহ করা হচ্ছে জ্বালানি, বরফ, খাবার ও প্রয়োজনীয় রসদ। দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘর ছাড়ার আগে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছেন তারা।
পাইকগাছা, কয়রা ও দাকোপের বহু পরিবারের জীবিকা সমুদ্রের মাছের ওপর নির্ভর করে। যাত্রা ও মাছ ধরার ধরন অনুযায়ী কেউ ১৫ দিন, আবার কেউ কয়েক মাস পর্যন্ত সমুদ্রে অবস্থান করেন। এ সময় মাছ পাওয়ার প্রত্যাশার সঙ্গে থাকে প্রতিকূল আবহাওয়া ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা।
তীর ছাড়ার পর জেলেদের জন্য যোগাযোগের সংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। গভীর সমুদ্রে মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা না থাকলে ঝড় কিংবা নিম্নচাপের খবরও সময়মতো পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। ফলে বিপদের খবর দেরিতে পৌঁছালে নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ও কমে আসে।
যোগাযোগের এই সংকট শুধু জেলেদের জন্য নয়, তীরে থাকা তাদের স্বজনদের জন্যও উদ্বেগ বাড়ায়। আবহাওয়া খারাপ হলে নৌকা কোথায় আছে, সবাই নিরাপদে আছেন কি না-এসব জানতে না পেয়ে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করতে হয় পরিবারের সদস্যদের।
সমুদ্রে নিজেদের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক জলসীমা শনাক্ত করাও নিরাপদ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে অবস্থান নির্ণয়ে উপযুক্ত জিপিএস যন্ত্র কাজে আসতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সেগুলো ব্যবহারের দক্ষতার অভাব থাকলে পথ হারানো কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য দেশের জলসীমায় ঢুকে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
গভীর সমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল হলে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে। তীর কিংবা কাছাকাছি থাকা অন্য নৌযানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে সহায়তা চাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। স্রোত ও বাতাসে নৌকা ভেসে যাওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় উদ্ধার-অপেক্ষায় কাটাতে হয় জেলেদের।
এসব ঝুঁকির মধ্যেই বড় অঙ্কের খরচ নিয়ে সমুদ্রে যেতে হয় তাদের। জ্বালানি, বরফ, খাবার, জাল ও নৌযান মেরামতে প্রয়োজন হয় বিপুল অর্থের। অনেকেই এসব খরচ মেটাতে ঋণ কিংবা দাদনের ওপর নির্ভর করেন। ফলে জাল ফেলার আগেই তাঁদের কাঁধে চাপে ঋণের টাকা ফেরত দেয়ার দায়।
কিন্তু সমুদ্রে গেলেই প্রত্যাশিত মাছ মিলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জালে মাছ কম উঠলে কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় আগেভাগে ফিরে আসতে হলে যাত্রার খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে। তখন আগের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি পরবর্তী যাত্রার পুঁজি জোগাড়ের চিন্তাও করতে হয়। এর প্রভাব পড়ে পরিবারের খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচে।
পাইকগাছা উপজেলার মাহমুদকাঠি জেলেপল্লীর শঙ্কর মন্ডল বলেন, "গভীর সমুদ্রে গেলে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না। তখন বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। ঝড়ের খবর সময়মতো না পেলে নিরাপদ জায়গায় ফিরে আসাও কঠিন হয়ে পড়ে।"
একই এলাকার আরেক জেলে কৌশিক গাঙ্গুলি বলেন, "সমুদ্রে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলে দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। আশপাশে অন্য নৌকা না থাকলে সাহায্য চাওয়াও কঠিন। অবস্থান জানিয়ে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ভরসা নিয়ে মাছ ধরতে যেতে পারতাম।"
চুকনগর গ্রামের জেলে আব্দুল জলিল বলেন, "সমুদ্রে যাই পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে। যাওয়ার সময় যেমন মাছ পাওয়ার আশা থাকে, তেমনি ফিরে আসতে পারব কি না, সেই ভয়ও থাকে। বিপদে যোগাযোগ ও উদ্ধারের নিশ্চয়তা পেলে আমাদের এবং পরিবারের দুশ্চিন্তা কমত।"
জেলেদের এই শ্রমকে ঘিরে উপকূলেও গড়ে উঠেছে বহু মানুষের জীবিকা। নৌযান মেরামত, জাল তৈরি, বরফ সরবরাহ, মাছ পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় নির্ভর করে মাছ আহরণের ওপর। ফলে সমুদ্রে একটি নৌযানের লোকসানের প্রভাব পড়ে একাধিক পরিবারের ওপর।
জেলেদের জীবনমান ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাওসেডের প্রধান নির্বাহী শামীম আরফীন বলেন, "সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সুরক্ষা প্রয়োজন। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে যাওয়া এসব মানুষের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।"
এ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, দুর্যোগের আগাম বার্তা পাওয়ার সুযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা চাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অবস্থান শনাক্তের সরঞ্জাম ব্যবহার ও বিপদের সময় করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ জেলেদের প্রস্তুতি আরও জোরদার করতে পারে।
জেলেদের এসব প্রয়োজনের কথা স্বীকার করছে মৎস্য বিভাগও। মৎস্য অধিদফতরের খুলনার উপপরিচালক বিপুল কুমার বসাক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পরামর্শ ও মতামত দেয়া হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগ মাঠপর্যায়ের জেলেদের কাছে কত দ্রুত পৌঁছাবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ ও উদ্ধার ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা মাছ না পেয়ে লোকসানে ফেরা জেলেদের আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন