প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন যে, শিক্ষকতা কখনোই ‘উপায়হীন বিকল্প’ বা সাধারণ চাকরির মতো পেশা হতে পারে না। তিনি বলেন, সরকার শিক্ষকদের নিয়োগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করছে যাতে শিক্ষায় সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে গ্রহণ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে।’
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত শিক্ষকরা এ সম্মাননা লাভ করেন।
এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হলো: ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’।
প্রধানমন্ত্রী দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। তিনি ‘গুণী শিক্ষক’ হিসেবে সম্মাননা পাওয়া শিক্ষকদের অভিনন্দন জানান এবং তাদের মেধা ও যোগ্যতার প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের ‘প্রয়োজন এবং প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে একজন সুনাগরিক হিসেবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা আরও সহজ হবে।’
পারিবারিক পাঠশালার গণ্ডি পেরোনোর পর শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই ‘আদর্শ রোল মডেল’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে, যাতে শিক্ষকরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এ সময়ে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে এসে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। তাই ‘শিখন’ ও ‘শিক্ষণ’ পদ্ধতির কৌশল পরিবর্তন এবং সিলেবাস আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।’
বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই হাতে পাবে।’
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন বইবিমুখ হয়ে না ওঠে, সেজন্য ‘শিখন’ ও ‘শিক্ষণ’ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখস্থ করার বদলে ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’- এই প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে তুলতে হবে। কৌতূহল তৈরি হলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আনন্দময় শিক্ষা’ বর্তমানে সারা বিশ্বে, বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এবার প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ শিরোনামে নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ ধরনের বই দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে যেমন বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় বড় চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে অবারিত করেছে। সার্টিফিকেট নির্ভর জ্ঞানের পরিবর্তে কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞান এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সামনেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোকে আরও আধুনিক করা জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিকে আমরা শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে দেখতে চাই না। বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের শক্তি। এ লক্ষ্যেই সরকার ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, এ কর্মসূচির আওতায় একজন শিক্ষক ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ এবং ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধাও বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না। শিক্ষাজীবনের যেকোনো পর্যায়ে কেউ কোনো কারণে ঝরে পড়লেও যেন বেকার না থাকে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।’
শিক্ষা খাত বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বাজেট আরও বাড়ানো হবে।’
মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপ্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২১ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিন লাখের বেশি শিক্ষক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছেন। এ পর্যায়ের শিক্ষার বড় অংশই বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে এখনও কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে শহর কিংবা গ্রাম- সব এলাকার শিক্ষার্থী যাতে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে।’
শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর মূল ভিত্তি হচ্ছে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার।’
কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজন হলেও কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনও শিক্ষার অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হতে পারে।’
সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মান- এসব মূল্যবোধকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে পরিবারের পর শিক্ষক-শিক্ষিকারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।’
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকতা পেশাকে আরও সম্মানজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য সরকার কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ঢেলে সাজানো হচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিবসে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে রাষ্ট্রীয় ভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন। চলতি বছর থেকে একটি নীতিমালার ভিত্তিতে এসব অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত একজন করে শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক কর্মরত থাকুন কিংবা অবসর জীবনে, তার মহান পেশার কারণেই আমৃত্যু তিনি রাষ্ট্রের কাছে সম্মানীয়।’
শিক্ষকদের বেতন ও অবসরভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধের নির্দেশনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একজন শিক্ষককে শুধু বেতন বা অবসরভাতার জন্য কষ্ট করে অফিসে ঘুরতে হবে না। যথানিয়মে যথাসময়ে তাঁর প্রাপ্য অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের শিক্ষকরাই জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।’
শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন