প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্ড্রেসকে স্মরণ করা হচ্ছে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ৬৫ বছর পেরিয়ে। ১৯৬১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এর একদিন আগে তার দুই মন্ত্রী ফাতিন রুশতু জোরলু এবং হাসান পোলাতকানকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ইস্তাম্বুলে মেন্ড্রেস ও তার দুই মন্ত্রীর স্মরণে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এক বিবৃতিতে তিন নেতার মৃত্যুদণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়াকে অন্যায্য বলে উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচনে জয়, এক দশক প্রধানমন্ত্রী
১৯৫০ সালের নির্বাচনে আদনান মেন্ড্রেসের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেটিক পার্টি ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে। তিনি প্রায় এক দশক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সরকারের অধীনে অর্থনীতিতে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয় এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। এর মধ্যে আরবি ভাষায় আজান দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৫২ সালে তুরস্ক ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার সময়ও তার সরকার ক্ষমতায় ছিল।
মেন্ড্রেসের রাজনৈতিক স্লোগান ছিল—‘যথেষ্ট, এবার কথা বলবে জনগণ’। এই কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত হন।
সামরিক অভ্যুত্থান ও গ্রেপ্তার
১৯৬০ সালের ২৭ মে একদল সামরিক কর্মকর্তা ক্ষমতা দখল করে। নিজেদের ‘ন্যাশনাল ইউনিটি কমিটি’ হিসেবে পরিচিত ওই গোষ্ঠী তুরস্কের সংসদ ভেঙে দেয় এবং প্রেসিডেন্ট জেলাল বায়ার ও প্রধানমন্ত্রী মেন্ড্রেসসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আটক করে।
পরে মেন্ড্রেস ও অন্যান্য নেতাদের বিচার ইয়াসিয়াদা দ্বীপে অনুষ্ঠিত হয়। তাদের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। ১৯৬১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ আদালত ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। শেষ পর্যন্ত মেন্ড্রেস, জোরলু ও পোলাতকানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অনুমোদন দেওয়া হয়।
জোরলু ও পোলাতকানকে ১৬ সেপ্টেম্বর ফাঁসি দেওয়া হয়। পরদিন ইস্তাম্বুলের কাছে ইমরালি দ্বীপে মেন্ড্রেসকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। প্রেসিডেন্ট জেলাল বায়ারের বয়স বেশি হওয়ায় তার মৃত্যুদণ্ড পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তন করা হয়।
তিন নেতার সম্মান পুনর্বহাল
মেন্ড্রেস, জোরলু ও পোলাতকানের মৃত্যুদণ্ড তুরস্কে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ১৯৯০ সালে তুরস্কের সংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সম্মান পুনর্বহাল করে। পরে তাদের মরদেহ ইস্তাম্বুলের একটি রাষ্ট্রীয় স্মৃতিসৌধে স্থানান্তর করা হয়। যে ইয়াসিয়াদা দ্বীপে তাদের বিচার হয়েছিল, সেটির নাম পরে ‘গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা দ্বীপ’ রাখা হয়।
স্মরণ অনুষ্ঠানে তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তাফা চিফতি জানান, তার পূর্বসূরি ইসমাইল নামিক গেদিকের মরদেহও ওই স্মৃতিসৌধে স্থানান্তর করা হবে। ১৯৬০ সালের অভ্যুত্থানের পর আটক গেদিক কারাগারে মারা যান। সামরিক কর্তৃপক্ষ তখন দাবি করেছিল, তিনি আটক থাকা সামরিক বিদ্যালয়ের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে তার পরিবার ওই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে।
চিফতি বলেন, গেদিকের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হয়েছিল, কিন্তু তারা সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন না। তিনি গেদিককে ১৯৬০ সালের দমন-পীড়নের ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে চিফতি মেন্ড্রেস, জোরলু, পোলাতকান ও গেদিককে জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্বকারী নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৯৬০ সালে জনগণের সেই ইচ্ছা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
তুরস্কের ইতিহাসে ১৯৬০ সালের পর ১৯৭১, ১৯৮০ ও ১৯৯৭ সালে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ২০০৭ সালে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে নির্বাচিত সরকারের প্রতি সতর্কবার্তার ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাইও তুরস্কে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস নিয়ে এখনো আলোচনা রয়েছে।
মেন্ড্রেসের মৃত্যুর ৬৫ বছর পরও প্রতি বছর তার স্মরণে অনুষ্ঠান হয়। তুরস্কের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার প্রধানমন্ত্রীত্ব, ১৯৬০ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড দেশটির বহুদলীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
সূত্র: দ্য ডেইলি সাবাহ
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন