প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
শান্ত ও সৌম্য চেহারার অধিকারী। স্যুট পরিহিত, গলায় টাই। হাতে একটি ছোট ব্রিফকেস। দেখলে মনে হতে পারে, তিনি সাধারণ যাত্রীর মতোই। কিন্তু বিমানে উঠার পর পরিবর্তিত হয় পুরো দৃশ্যপট। ব্রিফকেসে বোমা থাকার দাবিতে বিমানটি ছিনতাই করেন তিনি। এরপর ২ লাখ ডলার ও প্যারাসুট নিয়ে অন্ধকারে উড়ন্ত বিমান থেকে ঝাঁপ দেন। তারপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনের পোর্টল্যান্ড বিমানবন্দরে নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে এসে সিয়াটলের জন্য একটি একমুখী টিকিট ক্রয় করেন এক ব্যক্তি। টিকিটে নাম দেন ‘ড্যান কুপার’। বয়স আনুমানিক চল্লিশের কাছাকাছি। বিমানে উঠে তিনি বারবন ও সোডা অর্ডার করেন।
বিকেল ৩টার কিছু পরে, তিনি বিমানের এক বিমানবালার কাছে একটি নোট দেন। নোটে লেখা ছিল যে, তার ব্রিফকেসে বোমা রয়েছে এবং বিমানবালাকে তার পাশে বসতে হবে। পরে তিনি ব্রিফকেসটি সামান্য খুলে তার ভেতরে তার ও লাল রঙের কাঠির মতো বস্তু দেখান।
এরপর পাইলটের কাছে তার দাবি পাঠানো হয়। ছিনতাইকারীর শর্ত ছিল চারটি প্যারাসুট এবং ২০ ডলারের নোটে ২ লাখ মার্কিন ডলার দিতে হবে।
সিয়াটলে বিমান অবতরণের পর মুক্তিপণের অর্থ ও প্যারাসুট বিমানে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর ৩৬ যাত্রীকে তিনি ছেড়ে দেন। তবে কয়েকজন ক্রু সদস্যকে জিম্মি রেখে বিমানটিকে মেক্সিকো সিটির উদ্দেশে উড়াল দেওয়ার নির্দেশ দেন।
রাত ৮টার কিছু পরে, সিয়াটল ও রেনোর মাঝামাঝি কোথাও উড়ছিল বিমানটি। হঠাৎ বিমানের পেছনের অংশ দিয়ে প্যারাসুট ও মুক্তিপণের অর্থ নিয়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দেন ওই ব্যক্তি। পাইলটরা বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করলেও এরপর তাকে আর দেখা যায়নি।
ঘটনার পর মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই ‘নরজ্যাক’ নামে একটি বিশাল তদন্ত শুরু করে। বিমানে তল্লাশি চালানো হয় এবং শত শত মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। কয়েক বছরের মধ্যে ৮০০ জনের বেশি সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করা হয়। কিন্তু একে একে সবাই বাদ পড়তে থাকে।
তদন্তকারীরা বিমানে একটি কালো জে.সি. পেনি টাই খুঁজে পান। পরে সেখান থেকে ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। উদ্ধার করা হয় দুটি প্যারাসুট ও একটি ক্যানভাসের ব্যাগ। তবে ছিনতাইকারী কোন প্যারাসুট ব্যবহার করেছিলেন এবং লাফ দেওয়ার পর তার কী হয়েছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার কয়েক মাস পরে, রিচার্ড ফ্লয়েড ম্যাককয় নামে এক ব্যক্তিকে একই ধরনের বিমান ছিনতাই ও প্যারাসুটে পালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু বিমানবালাদের দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে তার চেহারার মিল না থাকায়, তাকে ডি.বি. কুপার হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি।
এদিকে, তদন্তকারীদের একটি বড় অংশের ধারণা, ভয়ংকর সেই লাফের পর কুপার হয়তো বেঁচে ছিলেন না। কারণ তার ব্যবহৃত প্যারাসুটটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল না। তার পোশাক ও জুতা দুর্গম বনাঞ্চলে অবতরণের জন্য অনুপযোগী ছিল। তার ওপর ছিল রাতের অন্ধকার এবং প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ।
তবে ১৯৮০ সালে রহস্যে নতুন অধ্যায় যোগ হয়। কলম্বিয়া নদীর কাছে এক বালক পচে যাওয়া একটি প্যাকেট খুঁজে পায়। ভেতরে ৫ হাজার ৮০০ ডলার ছিল। নোটগুলোর সিরিয়াল নম্বর পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো কুপারকে দেওয়া মুক্তিপণের অর্থের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
তাহলে কি নদী বা জঙ্গলে কোথাও মৃত্যুবরণ করেছিলেন কুপার? নাকি বিপুল অর্থ নিয়ে সফলভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি?
আরেকটি বিষয় নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে ‘ডি.বি. কুপার’ নামটি ব্যাপকভাবে পরিচিত হলেও, ‘ডি.বি.’ আসলে ভুলবশত ছড়িয়ে পড়া একটি নাম। মূল ছিনতাইকারী নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ড্যান কুপার নামে।
দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে তদন্ত করেও এফবিআই রহস্যের কোনো চূড়ান্ত সমাধান করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালের ১২ জুলাই সংস্থাটি জানায়, মামলাটিতে বরাদ্দকৃত তদন্ত সম্পদ অন্য কাজে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এরপর কেটে গেছে আরও বহু বছর। কিন্তু ১৯৭১ সালের সেই রাতের প্রশ্নগুলো আজও রয়ে গেছে। কে ছিলেন ড্যান কুপার? প্যারাসুট নিয়ে ঝাঁপ দেওয়ার পর তার কী হয়েছিল? মুক্তিপণের বাকি টাকা কোথায় গেল?
উত্তর মেলেনি কোনো প্রশ্নেরই। তাই মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসী বিমান ছিনতাইয়ের এই কাহিনি আজও এক অমীমাংসিত রহস্য।
সূত্র: এফবিআই
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন