প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরশক্তিচালিত সেচ ব্যবস্থার ফলে দেশের কৃষি খাতের পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের ফলে কৃষির উৎপাদন ব্যয় কমছে এবং ফসলের উৎপাদন বাড়ছে।
বিদ্যুতের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলায়। বিদ্যুৎহীন, খরা ও দুর্গম এলাকায় গত দুই বছরে ৩২টি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করার ফলে কৃষকদের সেচ খরচ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃষকদের সেচ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং পানির দক্ষ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে বরেন্দ্র অঞ্চলে এই সৌরশক্তিচালিত সেচ প্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)-এর যৌথ প্রচেষ্টায় এই পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি রাজশাহী বিভাগের ৬৭টি উপজেলার ৩ হাজার ২শ কৃষক উপকৃত হচ্ছেন। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ২০২৭ সালের জুন মাসে শেষ হবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানি বা ডিজেল এবং জাতীয় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের ওপর কৃষকদের নির্ভরতা কাটিয়ে একটি স্বাবলম্বী কৃষি কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল ও আধুনিক রূপ দেওয়ার কাজ চলছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক বোঝা লাঘব করতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাদের হাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রদান করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থা বা সৌর সেচ পাম্প নির্মাণ ও স্থাপন করা হয়েছে।
ফিক্সড সোলার ইরিগেশন (২ অশ্বশক্তি) ক্যাটাগরির আওতায় বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মোট ২৪টি স্থায়ী সোলার ইরিগেশন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।
এগুলোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট জমিতে নিয়মিত ও ঝামেলাহীনভাবে সেচ কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পোর্টেবল সোলার ইরিগেশনের মাধ্যমে কৃষকদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে সম্পূর্ণ সহজে স্থানান্তরযোগ্য আটটি পোর্টেবল সোলার ইউনিট প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকরা সহজেই এসব ইউনিট এক জমি থেকে অন্য জমিতে নিয়ে যেতে পারছেন। আর প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন পদ্ধতিতে আধুনিক ফলবাগান ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে মোট ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর প্রতিটি এক একর আয়তনের সুনির্দিষ্ট ফলবাগানের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তির সুবিধা হলো— এর জন্য জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগের প্রয়োজন হয় না এবং ডিজেলের দাম বা সংকটের চিন্তা করতে হয় না। বিদ্যুৎবিহীন দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাতেও এটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যাচ্ছে।
কৃষিবিদরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চল মূলত খরা ও পানি সংকট প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। বিগত কয়েক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় পানির সাশ্রয়ী ব্যবহারের বিকল্প নেই। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে কৃষি বিজ্ঞানীরা পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছেন। প্রকল্পের আওতাভুক্ত ‘প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন’ প্রযুক্তিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে সৌরচালিত পাম্পের সাথে ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাইপলাইনের সাহায্যে সরাসরি গাছের গোড়ায় পানি ফেলা হয়।
এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পানির অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মাটির উপরিভাগের আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকছে। গাছের শিকড় প্রয়োজনীয় পরিমাণ আর্দ্রতা পেলেও আগাছার উপদ্রব কম হচ্ছে। ফলের উৎপাদন এবং গুণগত মান আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ প্রযুক্তির সুফল সরাসরি পেতে শুরু করেছেন ওই অঞ্চলের কৃষকরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগী কৃষক মো. আলমগীর হোসেন জানান, আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে জমিতে সেচ দিতে গিয়ে খরচ বেড়ে যেত। উৎপাদন খরচের বড় অংশ সেচ বাবদ চলে যেত। সেচ মৌসুমের ওই সময়ে ডিজেল পাওয়াও যেত না, যা দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। এখন সৌরশক্তিতে খুব সহজে বাগানে পানি দিচ্ছি। এতে খরচ ও পানির অপচয় দুটোই কমেছে, আর গাছের পরিচর্যা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে।
এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে ইতিবাচক মূল্যায়ন কৃষি কর্মকর্তাদেরও।
রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, এই প্রযুক্তির সুফল ও কার্যকারিতা মাঠপর্যায়ে সফলভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো খরা প্রবণ এলাকায় জাতীয় গ্রিড বা আমদানিনির্ভর ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’—এর পরিচালক ও কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের সেচ খরচ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোর কার্যক্ষমতা কমে গিয়েছিল। সোলার পাম্প চালুর ফলে অনাবাদি জমিতে বছরে তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করলে এসব পাম্প ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত টেকসই হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, প্রচলিত ডিজেলচালিত পাম্পের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তির এই ব্যাপক ব্যবহার জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর দেশের চাপ কমাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত পানির সংকট, জলবায়ুর পরিবর্তন ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের এই কঠিন সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক আধুনিক সেচ প্রযুক্তি বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি খাতকে টেকসই, লাভজনক ও জনবান্ধব করে তোলার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সূত্র: বাসস
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন