প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকে অভিযোগ উঠেছে এক কম্পিউটার শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধকোটি টাকা সরকারি বেতন-ভাতা তোলার। বিদ্যালয়ে পাঠদান তো দূরের কথা, এক দিনের জন্যও তিনি সেখানে পা রাখেননি। তবুও নিয়মিতভাবে তার ব্যাংক হিসাবে সরকারি টাকা (এমপিও) ঢুকে যাচ্ছে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর, যা একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঘটেছে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই ঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম পীযুষ কান্তি ঘোষ। তার দাবি, তিনি ২০০৯ সালেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু কীভাবে তার ব্যাংক হিসাবে টাকা ঢুকছে তা তিনি জানেন না। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তাদের কারসাজিতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। তবে প্রধান শিক্ষকরা একে অপরের দিকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছেন। বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও এলাকাবাসী শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন ও শিক্ষা দফতর দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসও দিয়েছে।
দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবটি বর্তমানে তালাবদ্ধ। সেই বিষয়ে পাঠদানে কোনো শিক্ষক নেই। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিদ্যালয়টির শত শত শিক্ষার্থী কম্পিউটার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ ওই শিক্ষক ১৭ বছর ধরে বিদ্যালয়ে না থেকেও বেতনসহ সরকারি সব সুবিধা পাচ্ছেন।
বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষকের শূন্য পদে পীযুষ কান্তি ঘোষ যোগদান করেন। তিনি তিন বছর চাকরি করলেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় ২০০৯ সালে ঢাকায় গিয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হন। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও অদৃশ্য কোনো এক ক্ষমতার কারণে এমপিওভুক্ত হন শিক্ষক পীযুষ। সেই থেকে তিনি একবারও বিদ্যালয়ে আসেননি; অথচ ১৭ বছর ধরে সরকারি বেতন-ভাতার সুবিধা ভোগ করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত আছেন।
শিক্ষক পীযুষ কান্তি ঘোষের ব্যাংক হিসাবের (স্টেটমেন্ট) সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে সময় সংবাদ। জানা যায়, বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক নীরঞ্জন কুমার বসু (১৯৮৪-২০১২), এরপর অনন্ত কুমার বিশ্বাস (২০১২-২০১৪), তুষার কান্তি ঘোষ (২০১৪-২০২২), গোলক চন্দ্র বিশ্বাস (২০২২-২০২৫) এবং সবশেষ তুষার কান্তি ঘোষ (২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে অদ্যাবধি) দায়িত্ব পালন করেছেন। পীযুষ কান্তির বেতন উত্তোলনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উত্থাপন হয়েছে। চলতি বছরের জুনেও শিক্ষক পীযুষ কান্তির ব্যাংক হিসাবে টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়ে অবসরপ্রাপ্ত দুই প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং বর্তমান প্রধান শিক্ষক একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন।
সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলক চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, 'আড়াই বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেছি। তখন কম্পিউটার শিক্ষক পীযুষের বেতন বন্ধ রাখি। প্রধান শিক্ষক পুনর্বহাল হয়ে আবারও তার বেতন চালু করেন।' ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুযায়ী তার দায়িত্বকালীন সময়ে পীযুষের অ্যাকাউন্টে বেতন ঢুকেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি কোনো আবেদন করিনি, তবে কীভাবে ঢুকছে আমার জানা নাই।'
বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ অনুপস্থিত শিক্ষকের বেতন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা ও উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'বিভিন্ন সময়ে পীযুষকে নোটিশ করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। হাইকোর্টের এক রায় অনুযায়ী বরখাস্ত করলেও তার প্রাপ্য টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে। আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে চক্রান্ত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। সেই আড়াই বছরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলক পীযুষের বেতন চালু রেখেছিল। আমি যোগদান করে তার দেখানো পথে পীযুষের বেতন তিন মাস চালু রাখি, পরে আবার বন্ধ করে দিই।'
তিনি আরও দাবি করেন, শিক্ষকদের বেতন চালুর বিষয়ে কমিটির সিদ্ধান্তের বাইরে প্রধান শিক্ষকের সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থাকে না। তৎকালীন কমিটির সিদ্ধান্তে তিনি বেতন চালু রাখতে বাধ্য হন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে পীযুষ কান্তি ঘোষ জানিয়েছেন, '২০০৯ সালে স্কুলের চাকরি ছেড়ে এসেছি। বিদ্যালয়ে আর কখনো যাইনি। তবে এসব বেতন উত্তোলন ও এমপিওর বিষয়টি সম্প্রতি বিভিন্ন মারফতে জানতে পেরেছি। তবে এসব টাকার বিষয়ে আমার কিছু জানা নাই।'
তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, 'দীর্ঘ এত বছরে ব্যাংকে আমি কখনো যাইনি। কীভাবে আমার অ্যাকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে, কখনো ব্যাংক থেকেও আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।'
কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিন্নাতুল ইসলাম বলেছেন, 'একটি অভিযোগ পেয়েছি। দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. জালাল উদ্দিন বলেন, 'দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত থেকেও শিক্ষক পীযুষ সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন, যেটি গর্হিত অপরাধ। আর একজন শিক্ষকের একার পক্ষে এ কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। আমি সম্প্রতি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেছি। তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন সব দফতরে বিষয়টি জানাব। আশা করছি, এই চক্রের সকলের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'
এছাড়া উল্লেখযোগ্য যে, নড়াইলের কালিয়া উপজেলার দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরের বছর এমপিওভুক্ত হয়েছে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৪০১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন