প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
মানিকগঞ্জে অতিবৃষ্টির ফলে তৈরি হওয়া বন্যার কারণে জেলার ৪ হাজার ৮৮৫ জন কৃষক ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। শত শত হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা এখন গভীর সংকটে রয়েছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ গণমাধ্যমকে জানান, কৃষি মন্ত্রণালয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের উপর ভিত্তি করে এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য পর্যালোচনা করার পর, মানিকগঞ্জসহ সারাদেশে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
কৃষি বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র এই সপ্তাহে মানিকগঞ্জ জেলায় ৩০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি প্লাবিত হয়ে যায়। এর ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এ ব্যাপারে সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এবং মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে মানিকগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য জরুরি সহায়তা প্রদানের অনুরোধ করেছেন।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যদি কৃষকদের দ্রুত সহায়তা না দেওয়া হয়, তাহলে আগামী মৌসুমের উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে এবং জেলার কৃষি অর্থনীতি আরো বিপর্যস্ত হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাকে জানান, মানিকগঞ্জে সম্প্রতিক অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা খুবই কঠিন। তিনি বলেন, কৃষকরা যেন দ্রুত আবার চাষাবাদে ফিরতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই জরুরিভিত্তিতে পুনর্বাসন সহায়তা ও কৃষি প্রণোদনা দেওয়ার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, মানিকগঞ্জ রাজধানীর সন্নিকটে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উৎপাদনকারী জেলা। এখানকার কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সময়মতো সহায়তা প্রদান অপরিহার্য। যদি প্রয়োজনীয় বীজ, সার, কৃষি উপকরণ ও অন্যান্য সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাহলে তারা আগামী মৌসুমে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারবেন।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, কৃষকদের এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করবে। কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। যদি তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা যায়, তবে জেলার কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, মানিকগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উৎপাদনকারী জেলা। এই জেলার প্রায় ২৩৯ শতাংশ শস্য নিবিড়তার কারণে ধান, পাট, সরিষা, ভুট্টা, মরিচ, পেঁপে এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদনে পরিচিত। রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় এখানকার উৎপাদিত সবজি ঢাকার বাজারের উল্লেখযোগ্য চাহিদা পরিপূরণ করে। তাই, জেলার কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি রাজধানীর কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
চলতি মৌসুমে জেলায় ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁপে, ১০ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা, ২২১ হেক্টর পাট, ৪ হাজার ৫২১ হেক্টর বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং ৪৩০ হেক্টর মরিচের আবাদ হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে এসব ফসলের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ১৪৪ হেক্টর সবজি, ৫৫ হেক্টর পেঁপে, ১৬ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা, ৬ হেক্টর পাট ও ১ হেক্টর মরিচসহ মোট ২২২ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়েছে ১৭ হেক্টর সবজি, ১৯ দশমিক ২৫ হেক্টর পেঁপে, ৪ দশমিক ৬ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা, ১ দশমিক ২ হেক্টর পাট এবং ১০ হেক্টর মরিচের আবাদ।
কৃষি বিভাগের মূলায়নে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এসব জমি থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৭১ দশমিক ৫ মেট্রিক টন কৃষিপণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এই ক্ষতি সরাসরি প্রভাব ফেলে ৪ হাজার ৮৮৫ জন কৃষকের ওপর, যাদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অধিকাংশই ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলেন। কিন্তু ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে তারা এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন। যদি দ্রুত সরকারি সহায়তা না আসে, তবে আগামী মৌসুমে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।
এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য জরুরিভিত্তিতে বীজ, সার, কৃষি উপকরণ এবং আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা দ্রুত চূড়ান্ত করে স্বচ্ছতার সঙ্গে সহায়তা বিতরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর পাঠানো চিঠিটি তারা পেয়েছেন। সেখানে মানিকগঞ্জ জেলায় অতিবৃষ্টি এবং এর ফলে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সচিব বলেন, তাদের লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে দ্রুত চাষাবাদে ফিরে আসতে পারেন। এজন্য বীজ, সার, চারা এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকার কৃষকদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে আন্তরিক রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন