প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
টানা ভারী বর্ষণে একরাতের মধ্যে কক্সবাজারে ৮ রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এ ঘটনার জেরে ৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তবে এখনো চলমান ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের শঙ্কায় রয়েছেন রোহিঙ্গারা। পাশাপাশি অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে পাঠাতে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসন।
কক্সবাজারের উখিয়ার ক্যাম্প ১১, সি-১১ ব্লকে, রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল আব্দু রাজ্জাকের পরিবারের ৭ সদস্য। তখন ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছিল, এক পরিস্থিতে পাহাড়ের ঢালু ধসে গিয়ে ৫ জনই মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। স্থানীয় রোহিঙ্গারা শোর-চিৎকার শুনে এসে দ্রুত মাটি খুঁড়ে ৫ জনকে উদ্ধার করেন, তবে একই পরিবারের ৪ জন মারা যান এবং জীবিত একজনকে হাসপাতালে নেয়া হয়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর ছোট বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং হারুনুর রশিদ (৩) ও মোহাম্মদ রিহান (৫)।
নিহত উম্মে হাবিবার ভাই আমান উল্লাহ জানালেন, ‘রাতে আমাদের পরিবারের সাতজন সদস্য রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ রাত ১টার দিকে পাহাড়ধসে পুরো ঘর মাটিচাপা পড়ে যায়। ফলে আমি ও আমার আরেক ভাই কোনোমতে প্রাণে বেঁচে গেছি, কিন্তু পরিবারের বাকি পাঁচজন মাটির নিচে চাপা পড়েন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। মাটি খুঁড়ে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকি চারজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।’
এদিকে একই এলাকায় পাহাড় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন আরও অনেক রোহিঙ্গা পরিবার। যদিও স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের বার বার সরে যেতে বলছেন, কিন্তু অনেকেই তা শুনছেন না।
স্বেচ্ছাসেবক মো. সেলিম বলেন, ‘পাহাড়ের ঢালু ও পাদদেশে বসবাসকারী মানুষদের আমরা নিয়মিত সতর্ক করে থাকি। টানা ভারী বর্ষণের কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বারবার অনুরোধ করেছি। বিশেষ করে ক্যাম্প-২০-এর আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা ক্যাম্পের ভেতরে নিরাপদ স্থানে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের বসতিতে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অনুরোধে কিছু মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে গেলেও বেশিরভাগই তা গুরুত্ব দেননি। পরে রাতে হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে ক্যাম্প-১১-তে চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।’
অপরদিকে, উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ ডলার ত্রিপুরা জানান, রাতে ২টার দিকে ক্যাম্প ১৫ জামতলিতে পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের ৫ সদস্য। ঘটনাস্থলে খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ফায়ার সার্ভিস ছুটে যায়। ধীরে ধীরে ৩ ঘণ্টার চেষ্টা চালিয়ে ৫ জনকে উদ্ধার করলেও তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী এবং শিশুসহ ৩ জনের মৃত্যু হয়। অপর ২ জনকে হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং ছেলে মোহাম্মদ আনাস (৪)।
এছাড়াও রাত দুইটার দিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের ক্যাম্প-৭, ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসের একটি ঘটনা ঘটে। ওই সময় মো. একরাম (৭) নামে এক শিশু মারা যান, যিনি ওই আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা রশিদ উল্লাহর ছেলে।
এ বিষয়ে উখিয়াস্থ ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক মো. রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এই বৃষ্টিপাতের মাঝেও পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারি রোহিঙ্গাদের অন্যত্রে চলে যেতে মাইকিংসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ডলার ত্রিপুরা জানান, ‘প্রথমে আমরা ক্যাম্প-১৫-এ পাহাড়ধসের সংবাদ পাই। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করি। উদ্ধারকাজ চলাকালে ডিএমসি (ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কমিটি)-এর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে জানতে পারি, ক্যাম্প-১১-তেও পাহাড়ধসের কারণে চারজন চাপা পড়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘জানার পর আমি নিজেই ক্যাম্প-১১ এর ডিএমসি সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং জানতে চাই সেখানে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা প্রয়োজন কি না। তারা জানায়, স্থানীয় লোকজন দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। ফলে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা ক্যাম্প-১৫ এর উদ্ধার অভিযান শেষ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা কন্ট্রোল রুমকে অবহিত করি এবং পরে স্টেশনে ফিরে আসি।’
ডলার ত্রিপুরা জানান, ক্যাম্প-১৫-এ ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করেন এবং স্থানীয়রা আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। অর্থাৎ ওই ক্যাম্পে মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এসবে ক্যাম্প-১১-তে পাহাড়ধসের ঘটনায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিভাগীয় নির্দেশনা অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসের সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ডিএমসি কমিটির সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা করা হয়েছে। ক্যাম্পের মাঝি ও কমিউনিটির প্রতিনিধিদের ভূমিধসের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা হয়েছে। তাছাড়া মাইকিংয়ের মাধ্যমে বারবার ঘোষণা দিয়ে অতিভারী বা টানা বৃষ্টিপাতের সময় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জনগণকে সচেতন করার এই কার্যক্রম আগে থেকেই চলমান ছিল এবং এখনও অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনা এলাকায় রাত ৩ টার দিকে পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের ৩ জন। পরে স্থানীয়রা মা ও ছেলেকে বাঁচাতে সক্ষম হলেও বাবা আলী আকবর (৫০) মারা যান। তাঁর মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। সেখানে চলছে পরিবারের স্বজনদের আহাজারি।
নিহতের স্ত্রী জোৎস্না বলেন, ‘রাতে আমরা স্বামী, ছেলে ও আমি একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে খাটে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ গভীর রাতে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে ঘরের ওপর পড়ে, মুহূর্তেই আমরা মাটির নিচে চাপা পড়ে যাই।’
তিনি বলেন, ‘ভাগ্যক্রমে আমি ও আমার ছেলে কোনোমতে বের হয়ে আসতে পারলেও আমার স্বামী মাটির নিচে আটকা পড়ে যান। তিনি বাঁচার জন্য বারবার আকুতি জানাচ্ছিলেন। পরে স্থানীয় লোকজন মাটি খুঁড়ে তাকে উদ্ধার করেন, কিন্তু ততক্ষণে তিনি মারা গিয়েছিলেন।’
কক্সবাজার সদর মডেল থানার পরিদর্শক শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, শহরে পাহাড়ধসের ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং একই পরিবারের আহত দুজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। এখনো নিহতের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, রোববার বেলা ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েকদিনও জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে তাতে ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ। এর মধ্যে অন্তত ১ লাখ রোহিঙ্গা ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের মৃত্যু ঘটে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন