প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
সাভারের আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপের কারখানায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলার আসামি তালিকায় প্রীতি গ্রুপের মালিকপক্ষের কেউ অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আসামি হিসেবে কারখানার জিএম, এজিএম, প্রকৌশলী এবং কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আশুলিয়ার জামগড়ায় প্রীতি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির এলপিজি প্ল্যান্ট এলাকায় বিপজ্জনকভাবে রাখা সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করে। ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে, তবে বিস্ফোরণের ফলে কারখানার ভেতর ও আশপাশে ছিটকে পড়া সিলিন্ডারের আঘাতে সাতজন প্রাণ হারান। এই ঘটনায় অন্তত ৪০ জন শ্রমিক ও পথচারী গুরুতর দগ্ধ ও আহত হন।
মামলা দায়ের করেন আশুলিয়া থানার জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু তালেব। মামলার বিবরণীতে আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- জিএম মো. সোহেল রানা, এজিএম মো. মহিউদ্দিন, ম্যানেজার মো. মোজাম্মেল হোসেন, প্রকৌশলী মো. রাজীব হোসেন, হেলপার মো. আল আমীন এবং মো. এনামুল। এছাড়া অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিশ্চিত হলেও রাজীব আহমেদ তালুকদারের পরিবারকে বাদ রাখা হয়েছে। প্রীতি গ্রুপের সিইও রাজীব আহমেদ তালুকদার (পিয়াল) কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ সম্পাদক এবং বাকেরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তীতে বাকেরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ‘কাপ-পিরিচ’ প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার মা পারভীন তালুকদার প্রীতি গ্রুপের পরিচালক এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল’ ও ‘প্রীতি উলওয়্যার’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বাকেরগঞ্জ উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের (বরিশাল) সংসদ সদস্য ছিলেন। প্রীতি গ্রুপের মূল এমডি হিসেবে রয়েছেন রেজিন আহমেদ তালুকদার।
মামলা দায়েরের পূর্বে প্রীতি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক মো. মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "আহত ও নিহতদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার চেষ্টা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।" তিনি আরও জানান, রাজীব আহমেদ (পিয়াল) সিইও পদে থাকলেও তিনি গত ৪-৫ বছর ধরে এই প্রজেক্টে নিয়মিত আসেন না এবং প্রকল্পের কার্যক্রম মূলত এমডি রেজিন আহমেদ তালুকদার দেখভাল করেন। কারখানা পরিচালনা ও দায়িত্ব বণ্টন প্রকল্পভিত্তিক আলাদা করা হয়েছে। সিলিন্ডার রিফিল বা সরবরাহের দায়িত্ব থার্ড পার্টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের, তাই কারখানার নিজস্ব কোনো সিলিন্ডার তৈরির ব্যবস্থা নেই।
আশুলিয়া থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, "ঘটনায় আশুলিয়া থানায় ৯২ নাম্বার মামলা করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে যাদের দায়-দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেছে, তাদের নাম এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।" মামলায় ১০-১২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। তিনি জানান, পরবর্তীতে তদন্তে যাদের গাফিলতি বা অনিয়মের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। তবে মালিকপক্ষের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য নেই। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, মালিকপক্ষকে আড়াল করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসামি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটির সভাপতি মো. ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, "কোনো কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ভার কেবল বেতনভুক্ত সাধারণ কর্মচারীদের ওপর চাপানো অযৌক্তিক। বড় পদে থাকা মালিক কিংবা নির্বাহী পরিচালকদের গাফিলতিতেই এমন দুর্ঘটনা ঘটে।" তিনি আরও বলেন, "যানবাহন দুর্ঘটনা হলে যেমন মালিকের দায় আসে, তেমনি কারখানার অগ্নিকাণ্ডেও মূল দায়িত্ব মালিকপক্ষের। সাধারণ কর্মচারীদের বলির পাঁঠা বানিয়ে মালিকদের আড়াল করা শ্রমিকদের সঙ্গে প্রহসনমূলক আচরণ।"
ঘটনার পর প্রীতি গ্রুপের এমডির ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত রোববার প্রীতি গ্রুপের এস সূহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কারখানা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরিতে আকস্মিক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় লরির ভেতরে থাকা সিলিন্ডারগুলোতে আগুন ধরে যায় এবং আরও কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনে লরির ভেতরে ও আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা দগ্ধ হন। খবর পেয়ে জিরাবো ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ৪টি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা লরির ভেতর ও প্রাঙ্গণ থেকে মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় ৫টি মরদেহ উদ্ধার করেন।
বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শক্তিতে লরি বা সিলিন্ডারের একটি অংশ ২০০ গজ দূরে ছিটকে গিয়ে কাপড়ের দোকানের সামনে বসে থাকা মোছাম্মৎ জয়নব বেগম (৫৫) নামের এক নারী পথচারীর মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া দগ্ধ ও গুরুতর আহত অন্তত ২৬ জনকে উদ্ধার করে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বুলবুল হোসেন (৪৫) ও নজরুল ইসলাম (৫২)।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন