প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা মৌলভীবাজারটি হাওর-বাঁওড়, পাহাড় ও সমতল ভূমির সমন্বয়ে অবস্থিত। জেলা মৌলভীবাজারের বিভিন্ন টিলা এবং পাহাড়ি এলাকাগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। বর্ষার মৌসুমে প্রতি বছর টিলা ধসের ছোট-বড় ঘটনা ঘটে থাকে। গত চার বছরের মধ্যে টিলা ধসে অন্তত ১০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। हालেই টানা বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন স্থানে টিলা ধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ হলো, অবৈধভাবে টিলা কেটে মাটি বিক্রির কারণে ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবছর বর্ষার মৌসুমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে অবহিত করা হলেও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
বৃষ্টি হলে মৌলভীবাজারের পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভারী বৃষ্টিতে প্রায় প্রতি বছর জেলার কোথাও না কোথাও পাহাড় বা টিলা ধসের ঘটনা ঘটে। এর ফলে প্রাণহানি, আহত হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি এবং সড়কের ক্ষতি হয়।
টিলায় বসবাসকারী স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, আইনের তোয়াক্কা না করে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগর, জুড়ী, বড়লেখা ও কুলাউড়ার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালীরা টিলা কেটে মাটি বিক্রি করছেন। এসব মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে বসতবাড়ি, রিসোর্ট, বাগান ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে। এর ফলে বৃষ্টির সময় টিলা ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় বিস্তীর্ণ টিলা অঞ্চল বিস্তৃত রয়েছে। সেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ অন্তত ৫০ হাজার মানুষ বাস করে। শ্রীমঙ্গলের রাধানগর ও মহাজিরাবাদ এবং কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের কালেঙ্গা এলাকায় টিলা কেটে রাস্তা নির্মাণ, ছড়া দখল ও বসতবাড়ি, রিসোর্ট ও দোকান নির্মাণের অভিযোগ করা হয়। কোথাও কোথাও টাকা বিনিময়ে টিলার মাটি বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির অভাবে অবাধে টিলা কাটা চলছে। এর ফলে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের ঝুঁকি প্রতি দিন বাড়ছে। ভারী বৃষ্টি হলে তাদের আতঙ্কে থাকতে হয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া এলাকার বসবাসকারী সবিতা তাঁতী, শশী তাঁতী, ফ্রান্সিস কন্দ ও জয়ন্তী তাঁতী বলেন, প্রতি বছর বর্ষাতে পাহাড় ধসে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবুও যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা নেই। এবারও বসতির পাশের টিলায় বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় ধসে যেতে পারে। তিন বছর আগে পাশের টিলা ধসে চারজন মৃত্যু বরণ করেছিলেন। এখন নিজেদের টিলাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট শ্রীমঙ্গলের কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া চা-বাগানে টিলা ধসে চার নারী শ্রমিক নিহত হন। একই বছরে কুলাউড়ার ভাটেরা এলাকায় পাহাড় ধসে তিন শিশু এবং চাতলাপুর চা-বাগানে আরো এক নারী মারা যান। ২০২৪ সালের মধ্যে কমলগঞ্জের আদমপুর বনবিটের কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জিতে কাজ করার সময় টিলা ধসে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৃহস্থালির কাজে মাটি আনতে গিয়ে টিলা ধসে এক স্কুলছাত্রী নিহত এবং তিনজন আহত হন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে টিলা কাটতে গিয়ে ও পাহাড়ি বসতঘর ধসে আরো কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, টিলা কাটা মানে শুধু পরিবেশ নয়, পুরো প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষতি করা। সরকারকেই এ অপরাধ দমন করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। টিলা ধসের পেছনে অবৈধ টিলা কাটাই অন্যতম প্রধান কারণ।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম জানান, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অ-অনুমোদিতভাবে টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ পেলে নিয়মিত অভিযানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বর্ষার শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বাসিদের বিষয়ে সতর্কতা প্রদান করা হয়েছে।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, টিলা ধসে প্রাণহানি এড়াতে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণাসমূহ চালানো হচ্ছে এবং সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন