প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
গাজার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে যে পরিবেশগত প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে, তা এখন ইসরাইলের জনস্বাস্থ্যের ওপরও আঘাত হানতে শুরু করেছে। গাজার অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন, দূষিত ধ্বংসস্তূপ এবং বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত বর্জ্য ভূমধ্যসাগর, উপকূলীয় পরিবেশ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর যে চাপ সৃষ্টি করছে, তার প্রভাব সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরাইলেও পৌঁছাচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রতিনিধিরা ইসরাইল ও গাজাকে প্রভাবিত করা পয়োনিষ্কাশন ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কর্মগোষ্ঠী গঠনে সম্মত হয়েছেন। তবে, ওই কমিটিতে কারা থাকবেন এবং কীভাবে এটি কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
গাজার বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হওয়ায় প্রতিদিন এক লাখ ঘনমিটারেরও বেশি অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সরাসরি ভূমধ্যসাগর কিংবা স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়ছে। ওই অঞ্চলের সমুদ্রস্রোত সাধারণত দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে প্রবাহিত হওয়ায়, এসব বর্জ্য উপকূল ধরে ইসরাইলের জলসীমায় পৌঁছে যাচ্ছে।
দূষিত পানির কারণে ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলের আশকেলন লবণমুক্তকরণ বা পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট একাধিকবার বন্ধ করতে হয়েছে। গাজার বর্জ্যপানিতে উচ্চমাত্রার মলজাতীয় ব্যাকটেরিয়া দূষণের কারণে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সমুদ্রে বিষাক্ত শৈবালের বিস্তার ঘটাতে পারে। এসব শৈবাল পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থার ফিল্টার আটকে দেওয়ার পাশাপাশি মাছ ধরার এলাকাগুলোতে ‘ডেড জোন’ তৈরি করতে পারে।
পয়োবর্জ্যের বিষাক্ত রাসায়নিক, ভারী ধাতু এবং রোগজীবাণু সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে জমা হতে পারে। মাছ এক জলসীমা থেকে অন্য জলসীমায় চলাচল করার ফলে, দূষিত সামুদ্রিক খাবার ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি—উভয় পক্ষের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অপরিশোধিত পয়োবর্জ্যে থাকা রোগজীবাণু সামুদ্রিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি, উত্তরমুখী স্রোতের কারণে ইসরাইলের উপকূলীয় শহরগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ভূগর্ভস্থ পানিতেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
গাজার ভূগর্ভস্থ পানির দূষণও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগজীবাণু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ পানিতে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে এবং ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে, এমন দূষিত পানি সরাসরি ইসরাইলের পৌর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ঢোকার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে, লবণ ও বিভিন্ন রাসায়নিক দূষক আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে, দুই পক্ষের ব্যবহৃত অভিন্ন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বা অ্যাকুইফার দীর্ঘমেয়াদে দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সেচ, কৃষিকাজ এবং পানীয় জলের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির মান ও ব্যবহারযোগ্যতা কমে যেতে পারে।
গাজার ধ্বংসস্তূপও ইসরাইল ও পশ্চিম তীরে যাচ্ছে। গাজায় আনুমানিক ছয় কোটি টন ধ্বংসস্তূপ জমে রয়েছে। সম্প্রতি এর একটি অংশ ইসরাইল ও পশ্চিম তীরের অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে, ধ্বংসস্তূপে থাকা দূষক সরাসরি এসব এলাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউরো-মেড মনিটরের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি ইসরাইলি ট্রাক গাজা থেকে ধ্বংসাবশেষ নিয়ে বের হয়েছে। এই বর্জ্যের মধ্যে সীসা, পারদ এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু থাকতে পারে। বিশেষ ধরনের অস্ত্রের অবশিষ্টাংশ, সাদা ফসফরাসের কণা, অবিস্ফোরিত বিস্ফোরক, শিল্পকারখানার রাসায়নিক এবং পুরোনো ভবন ধ্বংসের ফলে বিপুল পরিমাণ অ্যাসবেস্টস ফাইবারও থাকতে পারে।
ভারী ধাতু এবং এসব রাসায়নিক মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসার, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, কিডনির সমস্যা এবং পরিবেশে বিষাক্ত পদার্থ জমে যাওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ধ্বংসস্তূপে পচনশীল মানবদেহের অবশিষ্টাংশ, জৈব বর্জ্য, রোগজীবাণু, পোকামাকড় ও ইঁদুরও থাকতে পারে। বাতাসে বিষাক্ত ধুলা, অ্যাসবেস্টস এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র কণা ছড়িয়ে পড়লে বায়ুর মান খারাপ হবে। পাশাপাশি, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ বিস্ফোরণের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
পরিবেশগত নিয়ম মানার আহ্বান
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দূষিত দুর্যোগ-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা বিধি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে। মানবদেহের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেলে কার্যক্রম তাৎক্ষণিক বন্ধ করার মতো ব্যবস্থা এসব প্রটোকলের অংশ।
ধ্বংসস্তূপ সীমান্ত বা প্রশাসনিক এলাকা পার করে অন্যত্র নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর আইন, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সমালোচকেরা বলছেন, গণকবর থাকতে পারে এমন স্থানে বুলডোজার চালিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো যুদ্ধাপরাধের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট করতে পারে। একই সঙ্গে যথাযথ পরিবেশগত বিধি না মেনে এসব বর্জ্য সরিয়ে নেওয়া সংগ্রহ ও ফেলার স্থানগুলোর আশপাশে বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্যকেও ঝুঁকিতে ফেলছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, গাজা ও ইসরাইলের পরিবেশগত বাস্তবতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে, গাজার মানবিক ও পয়োনিষ্কাশন সংকট শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের জনস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলবে।
১৯৯০ সালে জেরুজালেমের সাবেক মেয়র টেডি কোলেকও স্বীকার করেছিলেন যে, পূর্ব জেরুজালেমের আরব অধ্যুষিত এলাকায় অবহেলার কারণে কলেরা ছড়িয়ে পশ্চিম জেরুজালেমে পৌঁছানোর আশঙ্কায় তার প্রশাসন অন্তত মৌলিক পানি ও পয়োনিষ্কাশন লাইন সম্প্রসারণ করেছিল।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি যুদ্ধ বা মানবিক সংকটের বিষয় নয়; এটি একটি আন্তঃসীমান্ত পরিবেশগত সংকটও। মানবাধিকারগত দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন ছাড়াও, পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নিয়ম মেনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ইসরাইলি জনগণকেও ভোগ করতে হতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন