প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
শিক্ষায় সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে, এমন তথ্য জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বর্তমানে শিক্ষায় জাতীয় বাজেটের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এই বরাদ্দ ৫ শতাংশে নিতে চান। কুয়েটের প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব তথ্য তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। কুয়েট অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এমপি।
শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য মানসম্মত শিক্ষা একটি প্রধান ভিত্তি। তাই শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।
মন্ত্রী কুয়েটে শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারের ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উপাচার্যের কাছে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের হিসাব জানতে চাইলে ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে জানান। এই অর্থ সরকার বহন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হতো।
শিক্ষা খাতে এই বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষায়, “একবার ভেবে দেখেন, সরকার শিক্ষাখাতে কত বড় বিনিয়োগ করছে। ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা একটি ছেলের পেছনে খরচ করছে। এই হিউজ ইনভেস্টমেন্টের রিটার্নটা কী? সেটা আমাদের বুঝতে হবে।”
মন্ত্রী আরও বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন বা সুন্দর ক্যাম্পাস তৈরিই যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও অ্যালামনাই কার্যক্রমকে জোরদার করে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। তার মতে, বিশ্ব প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ মেধার কারণে পিছিয়ে নেই, বরং যথাযথ প্রচেষ্টা ও ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে।
শিক্ষার্থীদের নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আরও বেশি পড়াশোনা ও গবেষণায় মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এহছানুল হক মিলন বলেন, “ইউরোপ-আমেরিকার মানুষের মতো একই উপাদান দিয়ে সৃষ্টিকর্তা আমাদেরও সৃষ্টি করেছেন।” তাই গবেষণালব্ধ জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সাবেক শিক্ষার্থীরা কোথায় কাজ করছেন এবং তাদের কর্মসংস্থানের অবস্থা কেমন, এসব তথ্য থেকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তিনি ভালো র্যাংকিংয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কুয়েটের শিক্ষা কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ন্যানোটেকনোলজি ও রোবোটিক্সের মতো আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন মন্ত্রী। নতুন বিভাগ খোলার আগে তার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করার কথাও বলেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি বিল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট এবং আর্কিটেকচারের পাশাপাশি আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিংয়ের মতো বিভাগ চালুর আগে যৌক্তিকতা পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশকে শিক্ষা হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ‘ক্রস বর্ডার এডুকেশন’ চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলেও জানান এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, এটি চালু করা গেলে বিদেশে শিক্ষার্থীদের যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি বিদেশি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ দেশে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা ক্রস বর্ডার এডুকেশনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। এটা চালু করতে পারলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার অনেক সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি এর ফলে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টিও এ দেশে আমদানি করতে পারবো।”
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফল করা বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’-এর মাধ্যমে তাদের দেশে এনে উন্নয়নের কাজে লাগানোর কথা বলেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে জিপিএ-৫ পাওয়া ১ লাখ ১৬ হাজার শিক্ষার্থীকে ১ হাজার টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানান শিক্ষামন্ত্রী। মাধ্যমিক পর্যায়ের মেয়েদের শিক্ষায় উৎসাহিত করতে সাইকেল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। অন্য এক বক্তব্যে ছাত্রীদের জন্য উপহার হিসেবে পিংক সাইকেল দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও চিন্তাভাবনার কথা বলেন তিনি।
এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক নিয়োগের বিষয় জটিলতায় আটকে আছে বলে জানান এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, এসব জটিলতা দ্রুত দূর করে নিয়োগ নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়ার বিষয়েও কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। এ বিষয়ে শিগগিরই ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
কুয়েটের ইতিহাস তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে একসঙ্গে দেশের চারটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা বিআইটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। সে সময় তিনি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ওই সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর কুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করা হয়। ২০০৩ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠানটি বিআইটি থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এবারের আয়োজন ছিল বিশ্ববিদ্যালয় দিবস-২০২৬ ও ২৩তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে।
দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা উত্তোলন, প্রীতি সমাবেশ, আনন্দ র্যালি ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া প্রদর্শনী, বিভিন্ন বিভাগের প্রজেক্ট উপস্থাপন, ল্যাব উন্মুক্তকরণ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, সরকার সময়োপযোগী, আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত হবে, এটাই সরকারের প্রত্যাশা।
এআইয়ের যুগে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান হুইপ।
অনুষ্ঠানে কুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাজাহান আলী, ছাত্রকল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাসান আলী, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান আলী ও সাধারণ সম্পাদক রায়হান আহমেদ বক্তব্য দেন। উপস্থিত ছিলেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন