প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে বাংলাদেশ এখনও খেলার সুযোগ পায়নি, তবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরে দেশের উপস্থিতি দিন দিন আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। বাংলাদেশে জাতীয় দল মাঠে না থাকলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের পরিধানে থাকা জার্সিতে রয়েছে বাংলাদেশের শ্রম, দক্ষতা ও প্রযুক্তির ছাপ।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বিশ্বকাপের ম্যাচের জার্সি এবং স্পোর্টস অ্যাপারেল, যা আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পকে বৈশ্বিক ক্রীড়া বাজারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক সরাসরি এবং আরও কয়েক লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। গত দুই দশকে সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের স্পোর্টসওয়্যার, পারফরম্যান্স অ্যাপারেল এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া পোশাক উৎপাদনেও বাংলাদেশের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরীফুল আলম বাসস’কে বলেছেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন শুধুমাত্র সাধারণ পোশাক উৎপাদনেই নয়, বরং উচ্চমানের স্পোর্টস অ্যাপারেল তৈরিতেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্ষমতার স্বাক্ষর দিচ্ছে।
তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে বাংলাদেশে তৈরি জার্সির ব্যবহার দেশের শিল্প খাতের জন্য গর্বের বিষয়। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক অর্ডার দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করবে। সরকারের লক্ষ্য প্রযুক্তিনির্ভর এবং মূল্যসংযোজিত পোশাক উৎপাদন বাড়িয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।
জানা গেছে, বিশ্বখ্যাত অ্যাডিডাস, নাইকি, পুমা, হামেল, নিউ ব্যালেন্স, ম্যাক্রন এবং ক্যাপেলির মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ক্রীড়া পোশাক উৎপাদন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় ফুটবল দল, পেশাদার ক্লাব এবং সমর্থকদের জন্য জার্সি, ট্রেনিং কিট, শর্টস, জ্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের স্পোর্টস অ্যাপারেল তৈরি হচ্ছে। তবে কোন দেশের জার্সি কোন কারখানায় তৈরি হচ্ছে, সে তথ্য সব সময় প্রকাশ করা হয় না।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্রীড়া পোশাক বাংলাদেশের কারখানাতেই উৎপাদিত হয়। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং নিশ্চিত তথ্য সামনে এসেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক ক্রীড়া ব্র্যান্ড ‘ক্যাপেলি স্পোর্টস’-এর জন্য ঢাকার তুরাগে অবস্থিত ‘গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলিং লিমিটেড’ (জিএমএ) কেপ ভার্দে জাতীয় ফুটবল দলের অফিসিয়াল ম্যাচ জার্সি তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি খেলোয়াড়দের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার অফিসিয়াল ম্যাচ জার্সির পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের জন্য আরও প্রায় ১৩ হাজার ফ্যান জার্সিও রপ্তানি করেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বাংলাদেশের স্পোর্টস অ্যাপারেল শিল্পের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তারা বলছেন, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে বাংলাদেশের তৈরি জার্সির ব্যবহার শুধুমাত্র একটি রপ্তানি সাফল্য নয়, বরং এটি দেশের জন্য একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগও তৈরি করেছে। বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক যখন বিশ্বকাপের ম্যাচ উপভোগ করেন, তখন পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের উৎপাদন দক্ষতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও শিল্প সক্ষমতার পরিচিতিও বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়ার সম্ভাবনা জোরদার হয়।
বিশ্বব্যাপী স্পোর্টসওয়্যার শিল্পের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, পেশাদার ক্রীড়ার বিস্তার এবং অ্যাথলেজার পোশাকের জনপ্রিয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো নিয়মিতভাবে উৎপাদন বাড়াচ্ছে। এ পরিবর্তিত বাজারে প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয়, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারখানার কারণে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা আমেরিকা কিংবা অলিম্পিকের মতো বড় ক্রীড়া আসরের আগে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বিপুল পরিমাণ জার্সি ও ক্রীড়া পোশাকের অর্ডার দেয়। এসব অর্ডার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শ্রমিক, প্রকৌশলী, মার্চেন্ডাইজার, মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা, প্যাকেজিং, পরিবহণ, বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতেও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন চুক্তি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও বিশ্বকাপের জার্সি উৎপাদন থেকে অর্জিত আয়ের পৃথক কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই, তবে উচ্চমূল্যের স্পোর্টস অ্যাপারেল সাধারণ পোশাকের তুলনায় বেশি মূল্য সংযোজন করে। ফলে এ খাতের সম্প্রসারণ দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব কারখানা, আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং দক্ষ জনশক্তির কারণে বাংলাদেশ এখন শুধুমাত্র সাধারণ পোশাক নয়, বরং উচ্চমূল্যের ক্রীড়া পোশাক উৎপাদনেও বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে বৈশ্বিক স্পোর্টস অ্যাপারেল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব আরও বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব জোরদার করা গেলে দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাসস’কে বলেছেন, ‘বিশ্বকাপের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশে তৈরি জার্সির ব্যবহার আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন। এটি এক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক সাফল্য নয়, বরং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করে।’
তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশকে এখন শুধু সাধারণ পোশাক উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং উচ্চমানের স্পোর্টস অ্যাপারেল উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করছে। এর ফলে নতুন রপ্তানি আদেশ, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাড়ছে।
মাহমুদ হাসান খান আরও বলেছেন, স্পোর্টসওয়্যার খাতে অর্ডার বৃদ্ধি কর্মসংস্থান সম্প্রসারণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, পরিবহণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাসহ পুরো মূল্যশৃঙ্খলে এর সুফল পৌঁছে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও দক্ষতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পারলে বৈশ্বিক স্পোর্টস অ্যাপারেল বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন