প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর সীমান্তের পার্বতীপুর অংশে যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে বিরোধ এবং বাড়ি নির্মাণের মালামাল ক্রয়ের কারণে সৃষ্ট ক্ষোভের জেরে মনোরঞ্জন রায় (৫৫) নামের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহতের ছেলে বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আসাদুজ্জামান (৩৬) নামের এক যুবককে এবং গভীর রাতে চিরিরবন্দর উপজেলার ফতেজংপুর ইউনিয়নের বড় হাশিমপুর সরকারপাড়া থেকে আলোম হোসেন আলোকে (৪০) আটক করেছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে উপজেলার বেলাইচন্ডি ইউনিয়নের রাবেয়ার মোড় এলাকার নয়া মোল্লাপাড়ায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, নিহত মনোরঞ্জন রায়ের সাথে নয়া মন্ডলপাড়ার মৃত আজিজুর রহমানের কলেজজীবনের বন্ধুত্ব ছিল। অসুস্থতার কারণে আজিজুর রহমান মৃত্যুবরণ করলে, তাঁর বন্ধুরা একত্রিত হয়ে (মনোরঞ্জন রায়ের কিছু জমি মৃত বন্ধু আজিজুরের বাড়ির পাশে হওয়ায়) তাঁর পরিবারকে দেখভালের দায়িত্ব দেন। তখন থেকেই ওই পরিবারের সাথে মনোরঞ্জনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
অন্যদিকে, মৃত আজিজুরের স্ত্রী রোমানা বেগম ফরতাজ হোসেন (৫৬) নামের এক ব্যক্তিকে ধর্মপিতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর থেকে ফরতাজ প্রায়ই ওই বাড়িতে যাতায়াত করতে শুরু করেন। কয়েক মাস আগে, মৃত আজিজুরের স্ত্রী রোমানা বেগম ও তাঁর সন্তানেরা পুরোনো বাড়ি ভেঙে নয়া মোল্লাপাড়ার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নতুন বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। এতে প্রতিবেশী মোস্তাহার, আলোম হোসেন, আসাদুজ্জামান ও শরিফুল ইসলামের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং রাস্তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। প্রতিবেশীরা শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়কে দায়ী করেন নতুন বাড়ি নির্মাণের জন্য।
এছাড়াও, নতুন বাড়ি নির্মাণের সময় বিভিন্ন মালামাল ক্রয় ও শ্রমিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ধর্মপিতা ফরতাজ হোসেন বেশি দামের প্রস্তাব দিলেও শিক্ষক মনোরঞ্জন কম দামের প্রস্তাব দেন। শেষ পর্যন্ত মৃত আজিজুরের পরিবার শিক্ষকের প্রস্তাব মেনে মালামাল ক্রয় করে এবং বাড়ি নির্মাণ শেষ করে। এতে ধর্মপিতা ফরতাজ হোসেন চরম ক্ষুব্ধ হন। ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে তিনি ধর্মমেয়ের বাড়িতে এসে অশালীন কথাবার্তা বলেন এবং বকাবকি শুরু করেন। এর প্রতিবাদ করলে ধর্মমেয়ে রোমানা বেগমকে মারধর করেন ফরতাজ। পরে রোমানা বেগম মুঠোফোনে শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়কে বিষয়টি জানিয়ে দ্রুত তাঁদের বাড়িতে আসতে বলেন। শিক্ষক মনোরঞ্জন রায় মৃত আজিজুরের বড় ভাইকে সাথে নিয়ে বেলা ১১টার দিকে সেখানে পৌঁছান।
সেখানে পৌঁছামাত্র ফরতাজ শিক্ষক মনোরঞ্জনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করেন এবং ধর্মমেয়ের সাথে পরকীয়ার অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে শিক্ষক মনোরঞ্জন ফরতাজ হোসেনের গালে একটি চড় দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ফরতাজ প্রতিবেশী মোস্তাহার, তাঁর ছেলে আলোম হোসেন আলো, আসাদুজ্জামান এবং আরেক প্রতিবেশী শরিফুলকে ডেকে আনেন। তাঁরা এসে বেড়ার বাঁশের খুঁটি, কাঠের বাতা ও লাঠি দিয়ে শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়কে বেধড়ক মারধর শুরু করেন।
এ সময় নিহতের পরিবারের লোকজন বাধা দিতে গেলে তাঁদেরও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে সুযোগ পেয়ে শিক্ষক মনোরঞ্জন দৌড়ানোর চেষ্টা করলে আলোম হোসেন, ফরতাজ হোসেন, আসাদুজ্জামান ও শরিফুল একটি গাছের ডাল ভেঙে পেছনে ধাওয়া করেন এবং মারতে মারতে প্রায় দেড়শ মিটার দূরে একটি ধানখেতে ফেলে রেখে যান। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে এক শিশু ঘাস কাটতে গিয়ে ধানখেতে শিক্ষকের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার শুরু করলে পরিবারের লোকজন তাঁর মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন।
খবর পেয়ে ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং আসাদুজ্জামান নামের একজনকে আটক করে। বাকিরা পালিয়ে যান। নিহত মনোরঞ্জন রায় চিরিরবন্দর উপজেলার ইসবপুর ইউনিয়নের চকসুকদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং চকসুকদেবপুর গ্রামের মালিপাড়ার অসীম চন্দ্র রায়ের ছেলে।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পার্বতীপুর মডেল থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে আসাদুজ্জামানকে এবং গভীর রাতে চিরিরবন্দর উপজেলার ফতেজংপুর থেকে আলোম হোসেন আলোকে আটক করা হয়।
থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে চন্দন কুমার রায় বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ (দিমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং এজাহারভুক্ত অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন