প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট এবং প্রধান বিরোধী জোটের মধ্যে লড়াই প্রায় সমান পর্যায়ে রয়েছে। এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, দুর্নীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে মধ্যপন্থী বিরোধী শিবিরের সমর্থন বৃদ্ধি পাওয়ায় নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে প্রায় পাঁচ লাখ নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। ভোট দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে প্রায় ৭০ হাজার ইসরায়েলি দেশে ফিরছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত জনমত জরিপে ক্ষমতাসীন জোট ও প্রধান বিরোধী জোটের মধ্যে ব্যবধান খুব সামান্য দেখা গেছে। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকটের মধ্যপন্থী দল ইয়াশার সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। মরক্কোর শ্রমজীবী পরিবার থেকে উঠে আসা আইজেনকট শান্ত স্বভাব ও সংযত আচরণের জন্য পরিচিত। গাজা যুদ্ধে তিনি নিজের ছেলেকে হারিয়েছেন। নিজেকে ইসরায়েলের ধনী শহুরে অভিজাত শ্রেণির বাইরে থেকে উঠে আসা একজন মানুষ হিসেবে তুলে ধরে ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
শনিবার রাতে তেল আবিবের কেন্দ্রস্থলে বিরোধী দলের বিপুলসংখ্যক সমর্থক সরকার পরিবর্তনের দাবিতে সমবেত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই দুর্নীতির অবসান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর দাবি জানান। নির্বাচনী প্রচারে এআই-নির্ভর ভিডিওসহ নতুন কৌশলও ব্যবহৃত হচ্ছে।
আইজেনকটের বক্তব্যে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও শিক্ষার পাশাপাশি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি এমন একটি ইসরায়েলের কথা বলেছেন, যা একই সঙ্গে ইহুদি, গণতান্ত্রিক, উদার, সহনশীল ও সমতাভিত্তিক হবে। চলতি মাসের শুরুর দিকে এক টেলিভিশন বিতর্কে নেতানিয়াহুপন্থী এক বক্তা তাঁকে বর্ণবাদী ভাষায় আক্রমণ করলে তাঁর মরক্কীয় পরিচয় নির্বাচনী আলোচনায় উঠে আসে।
নেতানিয়াহুর সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন, তাঁর সরকার বিচারব্যবস্থার ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করেছে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আইজেনকটসহ বিরোধী নেতারা ক্ষমতায় গেলে এ ধরনের কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাম্প্রতিক এক জরিপে ইহুদি ইসরায়েলিদের ৭০ শতাংশের বেশি রাষ্ট্রীয় তদন্তের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ সংক্রান্ত আদালতের রায় কার্যকর করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন আইজেনকট। এই ইস্যুটি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর বিশেষ সুবিধা ও সামরিক দায়িত্বের সমতা নিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু তাঁর নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে জাতীয় নিরাপত্তাকে রেখেছেন। তাঁর প্রচারের অন্যতম স্লোগান ‘আত্মসমর্পণ নয়’। তিনি বিরোধীদের নিরাপত্তা প্রশ্নে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরছেন এবং আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব; তাঁদের অনেকেই নিজেদের ফিলিস্তিনি পরিচয়ের ইসরায়েলি নাগরিক হিসেবে বর্ণনা করেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলছে। সেদিন হামাসের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র যোদ্ধারা গাজার সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করেন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করেন। এটি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত। তবে নেতানিয়াহু দাবি করছেন, পরবর্তী সময়ে গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান দেশটির জন্য বড় হুমকি কমিয়েছে।
নেতানিয়াহুর কিছু সমর্থক মনে করেন, ৭ অক্টোবরের হামলার পর তাঁর নেতৃত্বে ইসরায়েলের আঞ্চলিক অবস্থান বদলে গেছে। তবে তাঁর দীর্ঘদিনের সমর্থকদের মধ্যে কেউ কেউ আরও ডানপন্থী দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। গাজার সীমান্তবর্তী সদেরো শহরের এক সাবেক সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন লিকুদ পার্টিকে ভোট দিলেও এবার তিনি ইতামার বেন-গভিরের কট্টর ডানপন্থী দল জিউইশ পাওয়ারকে সমর্থন করবেন।
তরুণ ভোটারদের মধ্যে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইয়েদিওথ আহরোনোথ পত্রিকার জন্য করা ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের ১৬ শতাংশের বেশি বেন-গভিরের মতো কট্টর ডানপন্থী দলগুলোকে বেছে নিতে পারেন। সদেরোর একটি ইহুদি ধর্মীয় কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, ৭ অক্টোবরের হামলা তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর করেছে।
তবে গাজার সীমান্তবর্তী নির ওজের মতো এলাকায় ভিন্ন মনোভাবও দেখা যাচ্ছে। ৭ অক্টোবরের হামলায় সেখানে ৪৭ জন নিহত এবং ৭৬ জন জিম্মি হয়েছিলেন। তিন বছর পর বাসিন্দারা এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। হামলায় দাদাকে হারানো ২৬ বছর বয়সী গাল পাউকার ও তাঁর মা গালিয়া মনে করেন, বর্তমান সরকারের পরিবর্তন প্রয়োজন। গালিয়া এবার আইজেনকটকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ছেলে আইজেনকট ও বামঘেঁষা ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়াইর গোলানের মধ্যে কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন।
নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিভক্তি থাকলেও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতানিয়াহু ও বিরোধীদের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য নেই। আইজেনকট ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনা অথবা সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেছেন। প্রধান বিরোধী নেতারাও অধিকৃত পশ্চিম তীরে কোনো না কোনো ধরনের ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের কেউই প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেননি।
নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। জনমত জরিপ অনুযায়ী, আরব দলগুলো এমনসংখ্যক আসন পেতে পারে, যা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে উঠবে। তবে ইসরায়েলের ইহুদি বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া অন্যরা এখন পর্যন্ত আরব দলগুলোর দুই জোটের সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করেছে।
এদিকে, ইরান থেকে নতুন হুমকির আশঙ্কা নিয়ে নেতানিয়াহুর সতর্কবার্তা, ভোটগ্রহণে সম্ভাব্য বিঘ্ন নিয়ে বিরোধীদের উদ্বেগ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়তে পারে বলে মানবাধিকারকর্মীদের সতর্কতা নির্বাচনের পরিবেশকে আরও জটিল করেছে। ফলে এবারের ভোট শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন