প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
সংসার জীবন, সন্তান লালন-পালন এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতা, কিছুই রীতি খাতুনকে দমাতে পারেনি। ত্রিশ বছর বয়সী এই গৃহবধূ, জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার নশিরপুর গ্রামের বাসিন্দা, ১৪ বছর পর এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
২০১০ সালে এসএসসি পাস করার পর রীতির বিয়ের ঘটনা ঘটে, যখন তার মা-বাবার সংসারে অভাব ছিল। এরপর সংসার জীবনের নানা ব্যস্ততা তাকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু তার পড়াশোনার প্রতি অদম্য ইচ্ছা এবং জেদ তাকে থামাতে পারেনি। স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় ২০২৪ সালে তিনি ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) শাখায় ভর্তি হন। গৃহস্থালির কাজ, গবাদিপশু দেখাশোনা, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল এবং মেয়ে লালন-পালনের পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।
রীতি খাতুন বলেন, “আসলে ২০১০ সালে আমি এসএসসি পাস করি মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। তারপরে বাবার আর্থিক অবস্থা খুব ভালো না, উনি আমাকে বিয়ে দেন। তো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই। তারপর ২০১১ সালে সেটা আমার বিয়ে হয়। তারপরে আমার মনে সেই ইচ্ছা শক্তিটা ছিল যে আমি পড়াশোনা করতে চাই। কিন্তু প্রতিকূল অবস্থার কারণে আমার পড়াশোনাটা হয়নি। শারীরিক অনেক খারাপ দিক থেকেও পারিনি। সংসারে অনেক ঝামেলা ছিল। তারপরে একসময় সন্তানের মা হই। তখন পড়াশোনার ইচ্ছা থাকলেও বাহিরে যেতে যাওয়ার বাইরে যাওয়ার মত আমার অবস্থা ছিল না। কিন্তু তারপরও দু চোখ ভরে আমার স্বপ্ন ছিল, মনে আমার ইচ্ছে ছিল যে আমি পড়াশোনা করব। অন্তত না হলেও কলেজ লাইভটা আমি শেষ করব এইরকম। তো আমার স্বামীকে আমি বলতাম সেও যে খুব যে আমাকে পড়াশোনা করাবে তাও না, সেও পারিপার্শ্বিক ঝামেলার দিক থেকেও তার ক্ষমতা হয়নি কিংবা সেও চেষ্টা করেও পারেনি। কিন্তু অবশেষে তার অনুপ্রেরণায় আমার ইচ্ছা শক্তিতে আমি ২০২৪ সালে ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হই। তো তার অনুপ্রেরণায় অবদান আমি শুধু তার অবদান অবদান নয়, আমি শিক্ষকদের অনেক সহযোগিতায় পেয়েছি। তারা আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছে, আমাকে ভালোবেসেছে, স্নেহ করেছে। তারা সব সময় আমাকে বলেছে তুমি এই বয়সে ভর্তি হয়েছো, তুমি অনেক কিছু করতে পারবে। ইনশাআল্লাহ আল্লাহর রহমতে এগিয়ে যাও। তো তাদের অনুপ্রেরণায় আমার স্বামীর অনেক অনেক অবদানের পরে আমি ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতে কৃতিত্বের সহিত এ প্লাস পেয়েছি। তো সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, তিনি যেন আমার প্রতি সদয় হন। আমার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। আমার একটা মেয়ে আছে। আমার স্বামীও যে খুব রোজগার করে তাও না। আমার প্রতি যেন দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমি যেন দেশের কল্যাণে এগিয়ে যেতে পারি। আমাকে যেন তিনি একটা চাকরি দেন কিংবা পড়াশোনার জন্য যেন আমার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমি যেন আরো পড়াশোনা করতে এগিয়ে যেতে পারি।”
রীতির স্বামী আব্দুল আলীম বলেন, “সে কাউকে তোয়াক্কা না করে নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখেছে। ঘরের কাজ শেষ করে গভীর রাতে কিংবা ভোরে বই নিয়ে বসে যেতো। আমি স্বামী হিসেবে তাকে নিয়ে গর্ববোধ করছি।”
প্রতিবেশী আবু রাইহান এবং তার কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমা আক্তার জানান, “রীতি চাচী আমাদের এলাকার গর্বিত স্ত্রী। তিনি সংসার সামলিয়ে এইচএসসিতে যদি জিপিএ ৫ অর্জন করতে পারেন, তাহলে আমরা কেন পারবো না।”
ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আনিছুজ্জামান সরদার বলেন, “প্রতিবেশীদের নানা উপহাস আর কটূ কথা সহ্য করে ব্যাগের পরিবর্তে সিমেন্টের বস্তায় করে বই পুস্তক নিয়ে রীতি খাতুন কলেজে আসা যাওয়া করেছে। সংসারের দায়িত্ব পালন করে রীতির এমন ফল সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই অধ্যবসায় অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক হয়ে থাকবে।”
অন্যদিকে ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাকির মুন্সী বলেন, “রীতি খাতুন একজন অদম্য ও অনুপ্রেরণামূলক ব্যক্তির নাম। আপনারা জানেন যে, ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে-হয়ার দেয়ার ইজ এ ইউল, দেয়ার ইজ এ ওয়ে অর্থাৎ ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। তো রীতি খাতুনের মাধ্যমে আবারও এই প্রবাদ বাক্যটি প্রমাণ হয়েছে যে, মানুষের ইচ্ছা থাকলে আসলে উপায় হয়। আপনারা অবগত আছেন যে, দীর্ঘ ১৪ বছর রীতি খাতুনের পড়াশোনার একটা গ্যাপ ছিল। পরবর্তীতে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এটা আসলে হচ্ছে আমাদের জন্য খুবই আনন্দের বিষয়। আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ এবং স্যালুট জানাই। কারণ হচ্ছে, তার এই অদম্য ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে সমাজে এমন একটি মেসেজ চলে যাবে যে, ইচ্ছা থাকলে আসলেই উপায় হয়। বয়স কোনো বাধা থাকে না শিক্ষার ক্ষেত্রে। যার ইচ্ছে থাকে, সে সব সময় সফলতা অর্জন করতে পারে।”
রীতি খাতুনের এই সাফল্যের মুক্তকণ্ঠ প্রশংসা করেছেন পরিবারের সদস্য, স্বজন, এলাকাবাসী, কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং উপজেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। রীতি খাতুন প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ইচ্ছা থাকলে এবং সঠিক পরিবেশ পেলে বয়স বা সামাজিক বাধা পড়াশোনার পথে কখনো দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন