প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
পটুয়াখালীতে একটি বিদ্যালয় শুধুমাত্র পাঠদানের স্থান নয়, বরং এটি শিশুদের নিরাপদ বেড়ে ওঠা, শারীরিক-মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ গঠনের ভিত্তি। কিন্তু, পটুয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী শেরেবাংলা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গত বহু বছর ধরে জলাবদ্ধতা এবং জরাজীর্ণ ভবনের কারণে সেই পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। যার ফলে, বিদ্যালয়ের ঝুঁকির পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান, খেলাধুলা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই কারণে শিক্ষার্থীদের শেখার সময় কমে যাচ্ছে এবং তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৮৫৭ জন শিক্ষার্থী এবং ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। যদিও বিদ্যালয়ে পাঁচটি ভবন রয়েছে, অধিকাংশই বহু বছর আগে নির্মিত। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়। এরপর, প্রায় ২৯ বছর কেটে গেলেও নতুন কোনো ভবন নির্মাণ হয়নি।
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে বড় বড় ফাটল, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া এবং ক্ষতিগ্রস্থ বারান্দাগুলি নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যালয়ের মাঠ, চলাচলের পথ এবং শ্রেণিকক্ষের সামনের অংশ পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায়, পানি জমে থাকার কারণে কিছুদিন ধরে শিক্ষার্থীদের পানি মাড়িয়ে শ্রেণিকক্ষে যেতে হচ্ছে। অনেক সময় সাপ, বিচ্ছু এবং অন্যান্য বিষধর প্রাণীর আতঙ্কও তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর অন্তত: তিন-চার দিন বিদ্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। বর্ষা মৌসুম জুড়ে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার ফলে অন্যান্য বিদ্যালয়ের তুলনায় প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ কম ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এর ফলে, নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করতে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চাপ নিতে হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার প্রভাব শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয়ের বৃহৎ খেলার মাঠটি বছরের প্রায় ছয় মাস পানির নিচে থাকায় নিয়মিত খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা (পিটি), কুচকাওয়াজ, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ, দলগত কাজের দক্ষতা এবং মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাহিমা মিনি বলেন, নতুন ভবন নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সুপারিশও ছিল। কিন্তু, এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর কয়েকদিন বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয় এবং নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষার্থী মিম, তাজনিন, সাম্মী, বিথি জানাচ্ছে, বৃষ্টি হলেই মাঠে হাঁটু সমান পানি জমে যায় এবং অনেক সময় ভিজে শ্রেণিকক্ষে যেতে হয়। যদি পানি বেশি জমে যায়, তাহলে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় মাঠ পানির নিচে থাকায় খেলাধুলা ও পিটি কার্যক্রমও বন্ধ থাকে।
বিদ্যালয় অভিভাবক আবুল কাশেম, মনোজ কান্তি, মঞ্জু মিয়া জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে সন্তানদের পাঠাতে তারা সবসময় উদ্বেগে থাকেন। একই সঙ্গে, নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানান তারা।
পটুয়াখালী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. মনিরুল কবির বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণ সরকারি অনুমোদন ও বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় সংসদ সদস্যের পাঠানো অগ্রাধিকার তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংকট শুধুমাত্র একটি বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; বরং এটি শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত। বছরের পর বছর পাঠঘণ্টা কমে যাওয়া, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান চলতে থাকলে একটি পুরো প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার এবং স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় সচেতন মহল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন