প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগেই দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর হাতে পরিমার্জিত পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিটি উপজেলায় শতভাগ মানসম্মত বই সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি জানায়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাপাখানাগুলোতে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বই মুদ্রণের কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বই সরবরাহ নিশ্চিত করতে ছাপাখানা থেকে মাঠপর্যায়ে বই গ্রহণের প্রতিটি ধাপে মান রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তদারকির অংশ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে ৫৩টি মনিটরিং দল সার্বক্ষণিক মাঠে কাজ করছে। ইতোমধ্যে মানদণ্ড পূরণ না করায় বিভিন্ন প্রেসের প্রায় সাড়ে চার লাখ ছাপানো ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল ও বিনষ্ট করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, কেবল মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নয়, বই গ্রহণের সময় মাঠপর্যায়ে কোনো অনিয়ম বা শৈথিল্য দেখা দিলে পাঠ্যবই গ্রহীতা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে। যেকোনো মূল্যে সরকার এ বছর নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ মানসম্মত ও নিখুঁত বই পৌঁছানোর জন্য বদ্ধপরিকর।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মাদ গোলাম ফখরুল মাওলা বলেন, "এ বছর বইয়ের মানের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গুণগত মান বজায় না থাকায় ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ বইয়ের ছাপানো ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের ছাপানো বই বাতিল করা হয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত ও নিখুঁত পাঠ্যবই উপজেলায় পৌঁছাতে মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি নিরলস কাজ করছে।"
চেয়ারম্যান আরও বলেন, "অতীতে প্রেস ও মাঠপর্যায়ে অসাধু চক্রের আঁতাতের সুযোগ থাকলেও এবার পাঠ্যবই গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ওপর প্রত্যক্ষ মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রিসিভ করার পরও বইয়ের মান নিয়ে কোনো বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রহীতা কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আনা হবে।"
স্তরভিত্তিক মুদ্রণের হালনাগাদ চিত্র
এনসিটিবির ২২ সেপ্টেম্বরের উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তর মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বইও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এবারের বইয়ের মুদ্রণ কাজ গত বছরের তুলনায় এক মাস আগেই শুরু হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রেসে এসব বইয়ের ছাপার কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।
প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৪২ লাখ ৬৬ হাজার ২৫৩টি (৭৪.৪৫ শতাংশ) ছাপানো শেষ হয়েছে। এ ছাড়া প্রাথমিক স্তরে ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৯৯৬টি (৩৬.৯৬ শতাংশ) এবং মাধ্যমিক স্তরে ২২ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২টি বইয়ের মধ্যে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ৪০০টি (৭ শতাংশ) ছাপা শেষ হয়েছে।
এনসিটিবির বিতরণ শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, "ইতোমধ্যে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বইয়ের ছাপা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরই মধ্যে বাঞ্ছারামপুর ও সরাইলসহ দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলায় বই সরবরাহের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় শতভাগ বই পর্যায়ক্রমে পৌঁছে দেওয়া হবে। কেবল ইংরেজি ভার্সন ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিশেষ বইসমূহ জেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে।"
এনসিটিবি জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ মোট ১১৩টির মধ্যে বর্তমানে সারাদেশে ৯১টি প্রেসে বই ছাপার কাজ চলছে। সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট সামলাতে বড় প্রেসগুলোতে জেনারেটর ব্যাকআপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। নতুন বইয়ের কাগজের জিএসএম ও প্রিন্টিং মান নিশ্চিত করতে পিডিআই (প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন) এজেন্সির পাশাপাশি ল্যাব টেস্ট করা হচ্ছে। সম্প্রতি ৯টি প্রেসের কাগজের নমুনা বিসিএসআইআরে ল্যাব টেস্ট করিয়ে মানসম্মত পাওয়া গেছে।
তিনস্তরে মনিটরিং ও গোয়েন্দা নজরদারি
এনসিটিবি জানায়, পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ প্রক্রিয়া ও সরবরাহ চেইনে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা, অনিয়ম বা কৃত্রিম সংকট তৈরি যেন না হয়, সেজন্য এনসিটিবির একদল চৌকস কর্মকর্তার নেতৃত্বে বিশেষ টিমের পাশাপাশি মাঠে কাজে লাগানো হয়েছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।
সংস্থাটি আরও জানায়, এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলে মোট ৫৩টি মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। এর মধ্যে এনসিটিবির নিজস্ব ৩৩টি মনিটরিং টিম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৭টি টিম সার্বক্ষণিক ছাপাখানাগুলোতে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। এ ছাড়া এনসিটিবির সচিব ও সদস্যদের নেতৃত্বে ৫টি বিশেষ টিম সরাসরি মাঠে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। মনিটরিং কর্মকর্তারা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত পর্যন্ত সরাসরি প্রেসে অবস্থান করছেন।
মান রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বইয়ের কাগজের উজ্জ্বলতা (৮৫ শতাংশ) ও মুদ্রণ মান নিশ্চিত করতে এনসিটিবির তদারকির পাশাপাশি নিয়োগকৃত পিডিআই এজেন্সির মাধ্যমে কেমিক্যাল ও গুণগত মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। র্যান্ডম ভিত্তিতে ইতোমধ্যে ৯টি প্রেসের কাগজের নমুনা বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) ল্যাব টেস্ট করা হয়েছে, যার সবকটি নমুনা মানসম্মত বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া মানদণ্ড পূরণ না করায় বিভিন্ন প্রেসের প্রায় সাড়ে চার লাখ ছাপানো ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল ও বিনষ্ট করা হয়েছে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, "উপজেলা পর্যায়ে বই সরবরাহে কোনো ধরনের নিম্নমানের কাগজের বই বরদাশত করা হবে না। সরকার বাজারদর যাচাই করে এবার যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে কম মূল্যের অজুহাতে কেউ নিম্নমানের বই তৈরির সুযোগ না পায়। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।"
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, "শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে বই পৌঁছে দিতে আমাদের রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রেস মালিকদের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই সরবরাহ শেষ করার স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাঠে নিয়োজিত টিমগুলো প্রতিদিন প্রেসে অবস্থান করে কাজ তদারকি করছে। আমাদের মূল লক্ষ্য— বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীরা যেন নতুন ক্লাসের পুরো সেট বই হাতে পায়।" সূত্র: বাসস
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন