প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
রাজধানীর মিরপুরে আবারও আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 'ফোর স্টার গ্রুপ' নামে পরিচিত একটি চক্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর এবং অর্থ ছাড়াই জমি দখল করতে গিয়ে এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটাচ্ছে। গত ছয় মাসে মিরপুর এলাকায় চাঁদাবাজির ঘটনায় মোট ৩৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। এ অপরাধ পরিস্থিতির বৃদ্ধি স্বীকার করে স্থানীয় সংসদ সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মিরপুরের বেশিরভাগ শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশে অবস্থান করায় তাদের গ্রেফতারে ইন্টারপোলের সহায়তা নিতে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত ২৭ জুলাই রাত প্রায় আড়াইটার দিকে পল্লবীর মদিনা নগর আবাসিক এলাকায় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্লটে হামলা চালায় ৬ থেকে ৭ জন কিশোর গ্যাং সদস্য। স্থানীয় কর্মীদের চিৎকার শুনে মালিক এবং পাশের স্থানীয়রা এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়, যাওয়ার সময় তারা দেখে নেওয়ার হুমকিও দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা ছয়-সাতজন নারীকে গরু পেটানোর মতো মারধর করে। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনও ছিনতাই করা হয় এবং চাপাতি দিয়ে আক্রমণ করা হয়।
এর ঠিক ১২ ঘণ্টা পরে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের বাসায় হামলা করে। বাসার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতে না পেরে দুই নিরাপত্তাপ্রহরীকে চাপাতি দিয়ে গুরুতর আহত করে। নিরাপত্তাপ্রহরী জানান, বাসার ভেতরে ঢুকে হামলাকারীরা এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে।
প্রতিষ্ঠানের মালিক অভিযোগ করেন, ফোর স্টার গ্রুপের সন্ত্রাসী মুক্তার দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা চেয়ে ফোনে হুমকি দিচ্ছিল। মুক্তার নিজেকে পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছে, ‘তোদের অনেক সম্পত্তি আছে, টাকা দিবি না? আমরা কীভাবে খাব? দিতে হবেই।’
আসন্ন স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সন্ত্রাসীদের অত্যাচারের কারণে এলাকায় স্বাভাবিকভাবে বসবাস করা জটিল হয়ে পড়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে এসব ঘটনার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, আগে যারা এসব অপরাধ করছিল, তারাই এখনো একইভাবে তাদের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা কার আশ্রয়ে এসব হামলা চালাচ্ছে, সেটিও জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
মদিনা নগর থেকে একটু দূরে পল্লবীর বাউনিয়াবাধ এলাকায় ২২ জুলাই সন্ত্রাসীরা ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে সুমাইয়া কসমেটিকসে হামলা করে। এরপর থেকে পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। পুলিশকে জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে সবাই আতঙ্কে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।
একই দিন পলাশনগরে ৫ থেকে ৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্য একটি গরুর খামারের ছবি তুলে চলে যায়। পরদিন গভীর রাতে তারা আবার ফিরে এসে অস্ত্রের মুখে খামারের মালিকের কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদার দাবি করে। টাকা না পেয়ে হামলা চালায়।
এছাড়া ৭ জুলাই একই এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি কিশোর গ্যাং একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় হামলা করেছিল ও লুটপাট চালায়। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি করে আসছে এবং তারা হুমকি দিয়ে বলছে, এলাকায় থাকতে হবে অথবা ব্যবসা করতে হলে চাঁদা দিতে হবে – না হলে কিছুই টিকবে না।
ফোর স্টার গ্রুপের একের পর এক অপরাধের কারণে পুরো মিরপুরজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত ছয় মাসে শুধু চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত মামলার সংখ্যা ৩৩টি। আর সাধারণ ডায়েরির (জিডি) পরিমাণও কম নয়।
চাঁদা না দিলে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর এবং টাকার বিনিময়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানোসহ জমি দখলের মতো অপরাধের কারণে মিরপুরের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। অনেক সময় এক সঙ্গে ১০০ থেকে ১৫০ জন হামলায় অংশ নিলেও পুলিশের হাতে ধরা পড়ছে হাতে গোনা কয়েকজন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন সন্ত্রাসীদের ধরতে পারছে না, নাকি সব কিছু জেনে নিয়েও ব্যবস্থা নিচ্ছে না?
ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বাতেন স্বীকার করেছেন, তার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, পুলিশ, র্যাব এবং স্থানীয়দের সমন্বয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা অবস্থার যে উন্নতি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। একই সঙ্গে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও বেড়েছে। মানুষের পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং পুলিশকে জনগণের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে কাজ করতে হবে।
তবে পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মিরপুরের বেশিরভাগ শীর্ষ সন্ত্রাসী বর্তমানে বিদেশে বসবাস করছেন এবং তারা তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে অপরাধ করছেন। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কিছুটা সময় লাগছে। ডিএমপির পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির বলেন, যারা আগে পল্লবীতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাত, তারা এখন বিদেশে অবস্থান করছেন। সেখান থেকে তারা তাদের অনুসারীদের দিয়ে দোকানপাটে হামলা ও চাঁদাবাজি করাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আগের মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
চাঁদাবাজি ও খুনের মতো অপরাধের পাশাপাশি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য সন্ত্রাসীদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন